৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন খাল খননের সিদ্ধান্ত, পুরনোগুলো উদ্ধারের কোন খবর নেই – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > প্রচ্ছদ > ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন খাল খননের সিদ্ধান্ত, পুরনোগুলো উদ্ধারের কোন খবর নেই

৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন খাল খননের সিদ্ধান্ত, পুরনোগুলো উদ্ধারের কোন খবর নেই

স্টাফ রিপোর্টারঃ রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের দুই পাশে ১০০ ফুট চওড়া খাল খননের কাজ শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৯১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৮৪ দশমিক ১৮ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণেই ব্যয় করা হচ্ছে। এদিকে রাজধানীর অসংখ্য খাল দখলে-দূষণে পরিত্যক্ত নালায় পরিণত হয়ে যাওয়ায় সরকারের এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান ও পুরনো খালগুলো সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া ছিল সবচেয়ে জরুরি। বিদ্যমান খালগুলো সংরক্ষণের অভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে। গত ৩২ বছরে রাজধানীর মানচিত্র থেকে ৩৯টি খাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ১৫টির মধ্যে মাত্র ৪টির অংশ লেক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও  অন্যগুলো ভরাট-দখলে সংকুচিত হয়ে নর্দমার আকৃতি নিয়েছে। এসব খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের কোনো সংস্থার উদ্যোগ নেই। এই বাস্তবতার মধ্যেও সোয়া ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন খাল কাটার কাজ শুরু হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার হিসাবেই নগরীতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ৫৪টি খালের অস্তিত্ব ছিল। বেশির ভাগ খালের মধ্যে পরস্পরের যোগসূত্র ছিল, এগুলোর সংযোগ ছিল রাজধানী লাগোয়া প্রধান চারটি নদ-নদীর সঙ্গে। সূত্রাপুর লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বছিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরার আবদুল্লাহপুর হয়ে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযোগ ছিল খালগুলোর। সেসবই এখন বিস্মৃত অতীত মাত্র। সরকার প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর মধ্যাঞ্চলে দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। অথচ হাতিরঝিলের পানি নিষ্কাশনের সহজ মাধ্যম রামপুরা খাল সংস্কার ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেগুনবাগিচা খালের ওপর বক্স কালভার্ট তৈরি করে তার ওপর রীতিমতো স্থায়ী সড়কপথ গড়ে উঠেছে। সেগুনবাগিচা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই বক্স কালভার্টের নিচে বর্তমানে আদৌ খালের কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা গবেষণার বিষয়। আবদুল্লাহপুর খালটি হরিরামপুর, রানাভোলা, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, দলিপাড়া হয়ে বাউনিয়ায় তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। রাস্তা ও রাজউকের প্লটের কারণে খালটি এরই মধ্যে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এখন ছোট নালায় পরিণত হয়েছে। উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর অংশে লেকের উত্তর প্রান্ত দখল করা হয়েছে ময়লা ফেলে। সেখানে প্লটও তৈরি করা হয়েছে। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বহমান খালটি এখন পুরোপুরি নর্দমা হিসেবেই ব্যবহূত হচ্ছে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের মান্ডা খাল সবুজবাগ থেকে শুরু হয়ে মাদারটেক, দক্ষিণগাঁওয়ের পাশ দিয়ে বালু নদে মিশেছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি ওই এলাকার পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। তবে দখল-দূষণে অনেক আগেই সংকুচিত হওয়া খালটি এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। খাল কীভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন হলো, তার কূলকিনারা বের করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা।

ঢাকার মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা খালটি ও খালসংলগ্ন জলাশয় এবং বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড় ভূমিদস্যুরা ইতিমধ্যে দখল-ভরাট করে নিয়েছে। সেখানে এখন সাইনবোর্ড আর ইটের ব্যারিকেড। নদী, খাল, জলাধারগুলো উদ্ধারে সরকারি তৎপরতা শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। শাস্তি পাচ্ছে না দখলকারীরা। এক যুগ আগেও শাহবাগ থেকে বড় মগবাজার পর্যন্ত পরীবাগ খাল, বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত আরামবাগ খাল ছিল। সময়ের ব্যবধানে খালগুলো সড়কে পরিণত হয়েছে। রাজাবাজার খাল, ধোলাইখাল-১, ধোলাইখাল-২, শাহজাহানপুর খাল, গুলশান-বনানী খাল, ধানমন্ডি খাল, দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়া খাল, রাজারবাগ-নন্দীপাড়া খাল, নাসিরাবাদ-নন্দীপাড়া খাল, নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী খাল, বাউখার খাল ও গোবিন্দপুর খাল এখন অস্তিত্বহীন।

উত্তরা আবাসিক এলাকা থেকে উত্তরখানের ভিতর দিয়ে টঙ্গী খালে গিয়ে পড়া কসাইবাড়ী খালটি বর্তমানে ড্রেনে রূপান্তর হয়েছে। মিরপুর সাংবাদিক কলোনি খাল, মহাখালী খাল, বাসাবো খাল, কল্যাণপুর খাল, গুলশান ও ধানমন্ডির খালগুলো নালায় পরিণত হয়েছে। মেরাদিয়া ও গজারিয়া খাল এখন জীর্ণ নালা। খাল দখল ও ভরাট করে খালখেকোরা তা প্লট বানিয়ে বিক্রি করছে। খাল উদ্ধারের নামে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ছোট-বড় অনেক অভিযান চালালেও কোনো কাজ হয়নি। অভিযানগুলোর পেছনে দখলবাজদের উচ্ছেদের চেয়ে পকেট ভারী করার অভিলাষ থাকায় খালগুলো মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

খাল দখল করার কৌশলগুলোও প্রায় অভিন্ন। শুরুতে স্রোতবাহী খালের পানিতে খুঁটি পুঁতে মাচান বানিয়ে শত শত বস্তিঘর বানানো হয়। এরপর ময়লা-আবর্জনা, উচ্ছিষ্ট ফেলে ভরাট করা হয় খাল, ছোট ছোট বাঁধ দেওয়ারও নজির রয়েছে। একপর্যায়ে প্রভাবশালী মহল এগিয়ে যায়, গড়ে তোলে পাকা স্থাপনা। খাল-নালা দখল ও নিশ্চিহ্ন করার ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ক্ষমতাসীনদের প্রচ্ছন্ন মদদে চোখের সামনে বিলীন হয়েছে এসব খাল। এর বিরূপ প্রভাবে প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ভোগেন নগরবাসী। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও খাল-বিল-জলাশয় দখল করা হয়েছে। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জয়নগর প্রকল্পের জন্য বিলীন হচ্ছে বাউনিয়া খালের অস্তিত্ব। সরেজমিন দেখা যায়, খালের ওপর বাঁশ, টিন দিয়ে অর্ধশতাধিক ঘর তোলা হয়েছে। এসব ঘর বানাতে খালের ওপর বাঁশ পুঁতে বাঁধের মতো করে পানির প্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে। খালের মধ্যে প্লাস্টিক বোতল, টিন, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য জমে আছে। কাফরুল, কচুক্ষেত, ভাসানটেক, ইবরাহিমপুর ও মিরপুরের নালার পানি এই খাল দিয়ে নামে। খালে পানি প্রবাহিত হতে না পারায় সব ময়লা এসে বাগানবাড়ী বস্তির সামনের অংশে জমছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. জামাল মোস্তফা বলেন, ‘খালটির পানিপ্রবাহ ঠিক থাকলে মিরপুরের জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকটাই কমবে। ’ এদিকে রাজধানীর খালগুলোর নজিরবিহীন অব্যবস্থার মধ্যেও পূর্বাচলে নতুন খাল খননের তোড়জোড় চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, রাজউকের পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের শুরুতে সড়কের দুই পাশে খাল খননের পরিকল্পনা থাকলে সরকারকে হাজার হাজার স্থাপনা ভেঙে বিপুল অর্থব্যয় করে খাল কাটার প্রয়োজন হতো না। প্রকল্প শুরুর অনেক পরে হঠাৎ করে খাল খননের সিদ্ধান্তে সরকারের কয়েক গুণ বেশি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের জায়গাজমি হাতছাড়া হচ্ছে। অথচ এই টাকা ব্যয় করেই রাজধানীর অনেক খালের পরিকল্পিত সংস্কার করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা যেত; যা রাজধানীর পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

Leave a Reply

Top