You are here
Home > প্রচ্ছদ > ৩২ বছরে ৩৯ খাল নিশ্চিহ্ন

৩২ বছরে ৩৯ খাল নিশ্চিহ্ন

স্টাফ রিপোর্টারঃ ধোলাইখালের কথা কি কারও মনে আছে? হারিয়ে গেছে ঢাকার বিখ্যাত সেই ধোলাইখাল। শুধু ধোলাইখালই নয়, রাজধানীর মানচিত্র থেকে গত ৩২ বছরে ৩৯টি খাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ১৫টির মধ্যে মাত্র চারটির অংশ লেক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অন্যগুলো ভরাট-দখলে সঙ্কুচিত হয়ে নর্দমার আকৃতি পেয়েছে। ঢাকা ওয়াসার হিসাবেই নগরীতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ৫৪টি খালের অস্তিত্ব ছিল। বেশির ভাগ খালের যোগসূত্র ছিল, এগুলোর সংযোগ ছিল রাজধানী লাগোয়া প্রধান চারটি নদীর সঙ্গে। যেমন— সূত্রাপুর লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বসিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরার আবদুল্লাহপুর হয়ে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযোগ ছিল খালগুলোর। সেসবই এখন বিস্মৃত অতীত মাত্র।

আবদুল্লাহপুর খালটি হরিরামপুর, রানাভোলা, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, দলিপাড়া হয়ে বাউনিয়ায় তুরাগ নদীতে গিয়ে মিশেছে। রাস্তা ও রাজউকের প্লটের কারণে খালটি এরই মধ্যে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এখন ছোট ছোট নালায় পরিণত হয়েছে। উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর অংশে লেকের উত্তর প্রান্ত দখল করা হয়েছে ময়লা ফেলে। সেখানে প্লটও তৈরি করা হয়েছে। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বহমান খালটি এখন পুরোপুরি নর্দমা হিসেবেই ব্যবহূত হচ্ছে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের মাণ্ডা খাল সবুজবাগ থেকে শুরু হয়ে মাদারটেক, দক্ষিণগাঁওয়ের পাশ দিয়ে বালু নদীতে মিশেছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি ওই এলাকার পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে দখল-দূষণে অনেক আগেই সঙ্কুচিত হওয়া খালটি এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। খাল কীভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন হলো, তার কূলকিনারা বের করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা।

ঢাকা মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বসিলা খালটি ও খাল সংলগ্ন জলাশয় এবং বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড় ভূমিদস্যুরা ইতিমধ্যে দখল-ভরাট করে নিয়েছে। সেখানে এখন সাইনবোর্ড আর ইটের ব্যারিকেড। নদী, খাল, জলাধারগুলো উদ্ধারে সরকারি তৎপরতা শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। শাস্তি পাচ্ছে না দখলকারীরা। এক যুগ আগেও শাহবাগ থেকে বড় মগবাজার পর্যন্ত পরীবাগ খাল, বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত আরামবাগ খাল ছিল। সময়ের ব্যবধানে খালগুলো সড়কে পরিণত হয়েছে। রাজাবাজার খাল, ধোলাইখাল-১, ধোলাইখাল-২, শাহজাহানপুর খাল, গুলশান-বনানী খাল, ধানমন্ডি খাল, দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়া খাল, রাজারবাগ-নন্দীপাড়া খাল, নাসিরাবাদ-নন্দীপাড়া খাল, নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী খাল, বাউখার খাল এবং গোবিন্দপুর খাল এখন অস্তিত্বহীন।

উত্তরা আবাসিক এলাকা থেকে উত্তরখানের ভিতর দিয়ে টঙ্গী খালে গিয়ে পড়া কসাইবাড়ি খালটি বর্তমানে ড্রেনে রূপান্তর হয়েছে। মিরপুর সাংবাদিক কলোনি খাল, মহাখালী খাল, বাসাবো খাল, কল্যাণপুর খাল, গুলশান ও ধানমন্ডির খালগুলো নালায় পরিণত হয়েছে। মেরাদিয়া ও গজারিয়া খাল এখন জীর্ণ নালা। খাল দখল ও ভরাট করে খালখেকোরা তা প্লট বানিয়ে বিক্রি করছে। খাল উদ্ধারের নামে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ছোট-বড় অনেক অভিযান চালালেও কোনো কাজ হয়নি। অভিযানগুলোর পেছনে দখলবাজদের উচ্ছেদের চেয়ে পকেট ভারি করার অভিলাষ থাকায় খালগুলো মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অভিন্ন কৌশলে বেদখল খালগুলো : খাল দখল করার কৌশলগুলোও প্রায় অভিন্ন। শুরুতে স্রোতবাহী খালের পানিতে খুঁটি পুঁতে মাচান বানিয়ে শত শত বস্তিঘর বানানো হয়। এর পর ময়লা-আবর্জনা, উচ্ছিষ্ট ফেলে ভরাট করা হয় খাল, ছোট ছোট বাঁধ দেওয়ারও নজির রয়েছে। একপর্যায়ে প্রভাবশালী মহল এগিয়ে যায়, গড়ে তোলে পাকা স্থাপনা। খাল-নালা দখল ও নিশ্চিহ্ন করার ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ক্ষমতাসীনদের প্রচ্ছন্ন মদদে চোখের সামনে বিলীন হয়েছে এসব খাল। এর বিরূপ প্রভাবে প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ভোগেন নগরবাসী।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও খাল-বিল-জলাশয় দখল করা হয়েছে। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভাষাণটেক পুনর্বাসন প্রকল্প ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জয়নগর প্রকল্পের জন্য বিলীন হচ্ছে বাউনিয়া খালের অস্তিত্ব। সরেজমিন দেখা যায়, খালের ওপর বাঁশ, টিন দিয়ে অর্ধশতাধিক ঘর তোলা হয়েছে। এসব ঘর বানাতে খালের ওপর বাঁশ পুঁতে বাঁধের মতো করে পানি প্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে। খালের মধ্যে প্লাস্টিক বোতল, টিন, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য জমে আছে। কাফরুল, কচুক্ষেত, ভাষাণটেক, ইব্রাহিমপুর ও মিরপুর এলাকার নালার পানি এই খাল দিয়ে নামে। খালে পানি প্রবাহিত হতে না পারায় সব ময়লা এসে বাগানবাড়ি বস্তির সামনের অংশে জমছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. জামাল মোস্তফা বলেন, খালটির পানিপ্রবাহ ঠিক থাকলে মিরপুর এলাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকটাই কমবে। মেয়র আনিসুল হক নিজে এসে খালের অবস্থা দেখে গেছেন। দেখে গেছেন ওয়াসার পরিচালক ও প্রকৌশলীরা। তবে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না।

ব্যক্তি মালিকানায় খাল কেনাবেচা : গুলশান লেক থেকে সুতিভোলা খালের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী শাহজাদপুর খালটির বড় অংশই কেনাবেচা হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ৩০ ফুট প্রস্থের এ খালটি পূর্বদিকে শাহজাদপুর কালভার্ট হয়ে খিলবাড়িরটেক কালভার্ট পর্যন্ত সরু নালায় রূপ নিয়েছে। খাল উন্নয়নের নামে ১৫/১৬ ফুট পাকাকরণ হয়েছে, খালপাড়ের বাকি জায়গা তুলে দেওয়া হয়েছে প্রভাবশালীদের হাতে। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী কোটি কোটি টাকার সরকারি খালের জায়গা ওয়াসা কর্মকর্তারা নামমাত্র মূল্যে গোপনে বিক্রি করে দিয়েছে। বিক্রি করে দেওয়া খালের ওপর পাইলিং করেই ক্রেতারা গড়েছেন ১৫/১৬ তলা উঁচু ভবন। জায়গার বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও এসব ভবনে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ পেতে কোনো সমস্যাও হয়নি। শাহজাদপুর কালভার্টের এক পাশে বেশ বড় করে ওয়াসার সাইনবোর্ডে খালের মালিকানায় লেখা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এ খালটি আবার প্রগতি সরণির নিচ দিয়ে কালভার্টের পশ্চিম পাশে পৌঁছেই বহুতল ভবনগুলোর মধ্যে হারিয়ে গেছে।

ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্রে হাজারীবাগের খালটিও ব্যক্তি মালিকানার সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। রায়েরবাজার থেকে হাজারীবাগ হয়ে এ খালটি কামরাঙ্গীরচর গিয়ে বুড়িগঙ্গার শাখা নদীতে মিশেছে। এটি ওই এলাকার পয়ঃনিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। এটি ছিল খাস জায়গা। মহানগর জরিপে এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। জানা যায়, ২০০৭ সালে জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে খালটি ব্যক্তি মালিকানাধীন উল্লেখ করে অধিগ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে খালের বিবরণে উল্লেখ করা হয়, খালে ৮০টি কাঁচাঘর, ২৫টি দোকান, ছয়টি দোতলা ভবন।

Leave a Reply

Top