You are here
Home > দূরনীতি ও অপরাধ > সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলার পর পেরিয়ে গেছে এক যুগ

সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলার পর পেরিয়ে গেছে এক যুগ

ক্রাইম রিপোর্টারঃ কর্মস্থলে ছুটছে মানুষ। অফিস-আদালতে কর্মচাঞ্চল্য। চাকা ঘুরছে কলকারখানার। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে জমজমাট হাটবাজার। হঠাৎ পাল্টে গেল সব। কর্মচাঞ্চল্যের বাংলাদেশে শুধুই আতঙ্ক। সকাল সাড়ে ১০টায় হাই কোর্টের মূল ফটকে বিকট শব্দে বোমার বিস্ফোরণ! প্রাণভয়ে মানুষ চারদিকে ছুটছে। মুহূর্ত কাটতে না কাটতেই জাতীয় প্রেস ক্লাবের গেটেও! পিলে চমকানো বোমার শব্দে মানুষ তখন দিশাহারা। হতচকিত হয়ে পড়ে রাস্তায় টহল পুলিশ। তাদের ওয়াকিটকিগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শুধু বোমা বিস্ফোরণের খবর ভেসে আসছে! রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে বিস্ফোরণের খবর আসতে থাকে ডিএমপি সদর দফতরে। শুরু হয় এবার পুলিশের ছোটাছুটি।   পুলিশ কন্ট্রোল রুমে আরও ভয়ঙ্কর খবর। শুধু রাজধানীতে নয়, ঢাকার বাইরেও বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। বোমা ফাটানো হয়েছে রংপুর, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা ও আরও অনেক জেলায়। টিভি চ্যানেলগুলোতে বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে শুধু ব্রেকিং নিউজ। স্ক্রলে একে একে আক্রান্ত জেলার নাম যুক্ত হচ্ছে। আতঙ্ক তখন রাজধানী ছাপিয়ে সারা দেশে। রাস্তায় যান চলাচল কমে যায়। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ভীষণ ব্যস্ত। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। অজানা আশঙ্কায় মানুষ। এক-দুই করে বোমার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫০-এ। মুন্সীগঞ্জ জেলা বাদে ৬৩ জেলার ৪৫০ স্থান সেদিন আক্রান্ত হয়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা— মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে বোমা হামলায় একযোগে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। ওই হামলায় দুজন বিচারক নিহতসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সেই দিনের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা মনে পড়লে আজও মানুষ শঙ্কিত হয়ে ওঠে। বিদেশি মিডিয়াগুলোর ব্রেকিং নিউজে ছিল বাংলাদেশের সিরিজ বোমা হামলার সংবাদ। দিনটি ছিল ১৭ আগস্ট, ২০০৫। আর এ বোমা হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে ৪৫০ বোমার বিস্ফোরণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম। এই সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, জঙ্গি সংগঠন জেএমবি তাদের শক্তি-সামর্থ্যের জানান দিল। জঙ্গিরা অধিকাংশ স্থানেই রিমোর্ট কন্ট্রোলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। কোথাও কোথাও টিফিন ক্যারিয়ার বোমা হামলা করে। এসব বোমা জঙ্গিদের নিজেদের হাতে তৈরি। জঙ্গিরা সিরিজ বোমা হামলার স্থান হিসেবে হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, বাংলাদেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেস ক্লাব ও সরকারি-আধা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেছে নেয়। হামলার স্থানগুলোতে জেএমবির লিফলেট পাওয়া যায়। লিফলেটগুলোতে ‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানায় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। দেশে কর্মরত বিচারকদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, দ্রুত এ দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হবে। প্রচলিত বিচারব্যবস্থা আমরা মানি না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জঙ্গিদের এমন শক্তি-সামর্থ্য দেখে হতবাক। তাদের ধারণায় ছিল না, গোপনে গোপনে জঙ্গিরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সেই সিরিজ বোমা হামলার পর থেমে থাকেনি জঙ্গি তৎপরতা। পুলিশ হত্যা করে প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনতাই এবং ব্যাংক লুটের ঘটনাও ঘটায়। হলি আর্টিজান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে সেই ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পথ ধরেই। সিরিজ বোমা হামলার পাঁচ বছর পর ২০১০ সালে জেএমবির সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু নিষিদ্ধ ঘোষিত সেই জঙ্গি সংগঠনটি গোপনে তাদের কার্যক্রম চালাতে থাকে। নব্য জেএমবি নামে জঙ্গিরা মাঠে নামে।

সূত্র জানায়, ১৫৯টি মামলার মধ্যে ১০টি মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়। মামলাগুলোতে আসামি করা হয় ২৪২ জনকে। পরে আসামি হয় ১১০৬ জন। তার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছিল ৯৬০ জনকে। অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ১৪৯টি। এখনো ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। যেসব মামলায় রায় হয়েছে তার মধ্যে ২৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ৩২০ জনকে। খালাস দেওয়া হয় ৩৪৯ জনকে। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৭ জঙ্গির। ঢাকার ৩৩টি স্পটে হামলার ঘটনায় মামলা হয় ১৮টি। তার মধ্যে চারটি মামলা আদালতে খারিজ হয়ে যায়। বাকি মামলাগুলো বিচারাধীন।

সূত্র জানায়, সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির তখনকার শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, হাফেজ মাহমুদসহ প্রায় ৭৫০ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ সাতজনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। এ মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অপর জঙ্গি আসাদুর রহমান আরিফ পলাতক রয়েছে। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই ৬ জঙ্গির পরে আর কারও ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

Leave a Reply

Top