You are here
Home > জাতীয় > সহায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক

সহায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক

স্টাফ রিপোর্টারঃ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনীতিতে। বিএনপি সহায়ক সরকার নিয়ে সরব হওয়ার পটভূমিতে এর পক্ষে ও বিপক্ষে ঈদের ছুটির মধ্যেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের পাল্টাপাল্টি বিতর্ক চলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর দেড়েক আগেই এ নিয়ে উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

এই বিতর্ক নতুন মোড় নেয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সহায়ক সরকারের এক নতুন ‘সংজ্ঞা’ দাঁড় করানোয়।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এবং আগের দিন কুমিল্লার গৌরীপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচনকালে শেখ হাসিনার সরকারই সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে। এটাই আমাদের সংবিধানের নিয়ম।’

অবশ্য বিএনপি এই নতুন ব্যাখ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, এটা ভোটাধিকার হারানো দেশের জনগণের সঙ্গে তামাশা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটা ওবায়দুল কাদেরের দলীয় সংজ্ঞা। এই সংজ্ঞা দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার নিয়ে তাঁদের এত ভয় কেন। তার মানে কোনো সমস্যা আছে। কী যে সমস্যা, সেটা তো দেশবাসী জানে।

এদিকে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে গতকালই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। দলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সংবিধানের দোহাই দিয়ে কোনো লাভ হবে না। সংবিধান হিমালয় পর্বত নয় যে তাকে নড়ানো যাবে না। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করাও সংবিধানের বিধান।’ তিনি মন্তব্য করেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচন করতে চান না। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোটের কথা শুনলেই তাঁরা মূর্ছা যান।’

প্রসঙ্গত, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি এবার নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের নাম দিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন দাবি করছে। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলটি সহায়ক সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে। তবে সেই রূপরেখা তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

২০১৩ সালে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেয়। ওই সরকারে বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্ব আছে এমন দলগুলোর সাংসদদের নিয়ে একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সহায়ক সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিএনপির সাংসদদের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করার প্রস্তাব করা হয়। অবশ্য সে সময় বিএনপি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির রূপরেখায় প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের বাইরে রেখে অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা কমিয়ে সহায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে। আগামী জুলাই মাসের শেষ অথবা আগস্টের শুরুতে এ ধরনের প্রস্তাব তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় নৌকার পক্ষে ভোট চাইছেন। তিনি একবারও কি বলেছেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে? এখন ওবায়দুল কাদের যে কথা বলেছেন, সেটার মূল কথাও একই। তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত হচ্ছে, সব দল যাতে নির্বাচনে অংশ না নেয়, যাতে তারা আবারও ক্ষমতায় থাকতে পারে।’

জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন অর রশিদ বলেন, ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য কোনো কিছুর ইঙ্গিত বহন করে না। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে যেভাবে নির্বাচন হয়, এই বক্তব্যে সে কথাই রয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনকালে যে শুধু রুটিনওয়ার্কটা পালন করে, তিনি সেটাকেই বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন যে ক্ষমতাসীন সরকার হবে সহায়ক সরকার আর নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। এর মধ্যে নতুনত্বের কিছু নেই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবি শুরু থেকেই নাকচ করে এলেও ওবায়দুল কাদেরের নতুন সংজ্ঞা ইঙ্গিতবহ বলে অনেকে মনে করেন। আওয়ামী লীগের নেতারা আগে বলে এসেছেন, উচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে।

গতকালও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ একই কথা বলেন। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আপনারা ডায়েরিতে লিখে রাখুন। আমি নিশ্চিত করে বলছি, প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেবেন।’

অবশ্য সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা জোর দিয়ে বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। সহায়ক সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন হবে। তাঁরা মনে করেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের মতোই আরেকটি ‘একতরফা’ নির্বাচন হবে।

এর উল্লেখ করে ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা ছেড়ে সহায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ১০ বছরে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। সে জন্য প্রয়োজন একটি সহায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যে নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে এবং সহায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা নির্বাচনকালে একটি নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা তৈরির কাজ করছি। তাই এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চাই না। বিএনপির চেয়ারপারসন তো বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না।’

Leave a Reply

Top