You are here
Home > অর্থনীতি > শ্রম অধিকারে বাংলাদেশ খারাপ দেশের তালিকায়

শ্রম অধিকারে বাংলাদেশ খারাপ দেশের তালিকায়

স্টাফ রিপোর্টারঃ  শ্রম অধিকার নিশ্চিতে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। শ্রমিক হত্যা, ইউনিয়ন করতে না দেয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর মনোভাব, অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো বিষয়ের কারণে বাংলাদেশ শ্রমিকদের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। এমন তথ্য উঠে এসেছে শ্রম অধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের (আইটিইউসি) ‘শ্রম অধিকার সূচক ২০১৭’ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে ১৩৯টি দেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ছাড়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আছে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কলম্বিয়া, মিসর, ফিলিপাইন, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও কাজাখস্তান। প্রতিবেদনে শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে একটি দেশের সার্বিক অবস্থান তুলে ধরতে সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ৫ নম্বর দেয়া হয়েছে। একটি দেশ ৫ নম্বর পেলে ধরে নেয়া হয়েছে সেখানে শ্রম অধিকার বলতে কিছু নেই। আর ১ নম্বর পাওয়ার অর্থ হলো ওই দেশে শ্রমিকেরা মোটা দাগে সব ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন। ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

আইটিইউসির প্রতিবেদন অনুসারে, গত এক বছরে ১১টি দেশে শ্রমিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই ১১টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। খুন ছাড়াও শ্রমিকদের ওপর সহিংস হামলা, অপহরণ, হুমকি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও বাংলাদেশে গত এক বছরে বেড়েছে। শ্রমিকদের ওপর এমন হত্যা-বহির্ভূত নির্যাতনের ঘটনা গত বছর ঘটেছে ৫৯টি দেশে, যা এক বছর আগে ছিল ৫২।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে ট্রেড ইউনিয়ন দমনের বিষয়টি এখানে খুবই উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আশুলিয়ায় বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালনে মালিকপক্ষের দমননীতির বিষয়টি উঠে এসেছে। আশুলিয়ার ওই শ্রমিক আন্দোলন দমনে কারখানা বন্ধ, কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। ৩৫ জন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও শ্রম অধিকারবিষয়ক আইনজীবীকে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়।

সরকার ও মালিকপক্ষের এ ধরনের দমননীতি এবং বাধা-বিপত্তির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা খুবই কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাড়ে চার হাজার পোশাক কারখানার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন থাকার বিষয়টি শ্রম অধিকার পরিস্থিতির জন্য সহায়ক নয় বলে মনে করে আইটিইউসি।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে কর্মপরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবে একেবারে কোনো সমস্যা নেই, সেটি বলা যাবে না। কিন্তু এই প্রতিবেদনে যেভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে, সেটি খুবই একপেশে।

ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনা নোটিশে কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। গত বছর মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরনের বাংলাদেশ কার্যালয় থেকে ১৪৫ জন কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টি প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন ও চাকরি স্থায়ী করার দাবি তোলায় তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অঞ্চল হিসেবে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়। এর পরের স্থানে আছে যথাক্রমে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ও আফ্রিকা। আর শ্রম অধিকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতারে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার না থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে কাতারে এখন যে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে, সেখানে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনে যুদ্ধের কারণে আইনের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শ্রমিক অধিকারও মানা হচ্ছে না। ইয়েমেনে সাড়ে ছয় লাখ সরকারি চাকুরের আট মাস ধরে বেতন না পাওয়া ও বেসরকারি খাতে ৪০ লাখ কর্মসংস্থান নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আফ্রিকার শ্রম অধিকার পরিস্থিতি গত এক বছরে আরও খারাপ হয়েছে বলে মনে করে আইটিইউসি। এর মধ্যে বেনিন, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়ের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।

করপোরেট কোম্পানির স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে। আইটিইউসির মহাসচিব শ্যারন বারোর মতে, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করার পেছনে একটি দেশের সরকার ও করপোরেট কোম্পানির গোপন সমঝোতার বিষয়টি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এতে অস্থায়ী চুক্তিতে থাকা দেশি-বিদেশি সব ধরনের শ্রমিকেরা বঞ্চনার শিকার হন।

Leave a Reply

Top