You are here
Home > আন্তর্জাতিক > রোহিঙ্গা বিতাড়নের দুই মাস : পাশবিকতা থামায়নি মায়ানমার

রোহিঙ্গা বিতাড়নের দুই মাস : পাশবিকতা থামায়নি মায়ানমার

মায়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু করার পর আন্তর্জাতিক নিন্দা ও তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও গত দুই মাসেও রাখাইনে মানবাধিকার পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। রাখাইনে সেনারা রোহিঙ্গাদের প্রতি পাশবিক আচরণ এখনো থামায়নি। তবে পাশবিকতার ধরণ পাল্টেছে। রাখাইনে এখনো থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলমানরা এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। মায়ানমার সেনারা তাদেরকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটের মধ্যে জীবন পার করছেন তারা। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এসব রোহিঙ্গা রাখাইনে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে টিকে থাকার জন্য চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ছোট দল বেঁধে রোহিঙ্গারা এখনও বাংলাদেশে চলে আসছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে বুচিদংয়ের টঙবাজার ও কোয়াংচিবন থেকে আটজনের একটি রোহিঙ্গা দল আনজুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তারা হচ্ছেন- বুচিদংয়ের টংবাজার এলাকার আবু তাহেরের পুত্র হারেস আহমদ (২০), নবী হোসেনের পুত্র আতাউল্লাহ (২২), আমান উল্লাহ (১২) ও শাকের উল্লাহ (২৫), এনায়েত হোসেনের পুত্র আজম (২৮), কোয়াংচিবন এলাকার নূর আহমদের পুত্র ছাদেক হোসেন (৩৩), মোহাম্মদ আমিনের পুত্র মোহম্মদ আরফ (২৬) ও ছৈয়দের পুত্র মোহাম্মদ কেফায়েত (৩০)। এই আটজন রোহিঙ্গার পেশা ব্যবসা ও কৃষিকাজ। তাদের অনেক জমিজমা, ধানের গোলা ও চিংড়ি ঘের আছে। তাদের সাথে সীমান্তে কথা এই প্রতিবেদকের।

তারা জানান, মায়ানমার সেনাদের নির্যাতন গণহত্যা থেকে বাঁচতে তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন। চরম নির্যাতনের মুখেও তারা এতদিন রাখাইনে ছিলেন মায়ানমার সেনাদের হাতে অর্থ দিয়ে। সপ্তাহে তারা একদিন কেনাকটা করার জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারতেন খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ। মায়ানমার সেনারা তাদের ১০ দিন ঘর থেকে বের হতে দেয়নি। বলছে না খেয়ে মরে যাও। অবশেষে উপায় না দেখে তারা বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পাড়ি দেন।

তারা আরো জানান, মায়ানমার সেনাদের এখন কৌশল হচ্ছে খাবার ও পানি বন্ধ করে দিয়ে ঘরে অবরুদ্ধ করে রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। রাখাইনের বুচিদং থানার রৈঙ্গাদং এলাকার দিল মোহাম্মদের মেয়ে রেনু আক্তার তার স্বামীকে ধরে নিয়ে হত্যার পর অনেক আগেই পাঁচ সন্তান নিয়ে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তার বাবা-মাসহ পরিবারের আরো ১৩ সদস্য এখনও রৈঙ্গাদং এলাকায় রয়েছেন। রেনু আক্তার বাবা মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে জানান, তাদেরকে গত পনের দিন ধরে মায়ানমার সেনারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তাদের এখন চরম খাদ্য সংকট চলছে। এখন তাদের না খেয়ে মরতে হবে।

রোহিঙ্গা শিশুরা মারাত্মক সংকটে
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর প্রধান নির্বাহী হ্যালে থরনিং গত শনিবার বলেছেন, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। সেই সাথে শিশুরা পাচার, যৌন নির্যাতন ও শিশু শ্রমের ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বলেন, হাজার হাজার শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। সঠিক চিকিৎসা ও খাদ্য না পেলে এসব শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। দারিদ্রতা, খাদ্যাভাব ও অশিক্ষা অপুষ্টির কারণ। রোহিঙ্গারা এর সবকিছুর শিকার। তাই অপুষ্টিও এদের মধ্যে বেশি। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে যে ত্রাণ তৎপরতা চলছে তাতে অপুষ্টির শিকার শিশুদের জন্য পৃথক কিছু নেই।

ইউনিসেফের হিসাব মতে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা তিন লাখ ৪৮ হাজার। এরা মোট রোহিঙ্গার প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০ অক্টোবর পযর্ন্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশু পাওয়া গেছে ১৬ হাজার ৯৬৫টি। এ সংখ্যা অনেক বেশি ও বিপজ্জনক বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এসব শিশুর জন্য প্রয়োজন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া। কিন্তু উখিয়া এবং টেকনাফে শিশুদের এমন চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই এবং নেই পর্যাপ্ত শিশু বিশেষজ্ঞ। তাছাড়া অপুষ্টির শিকার শিশুদেরকে দায়িত্বপালনকারী চিকিৎসকেরা হাসপাতালে ভর্তির উপদেশ দিলেও হাসপাতালে যাচ্ছে খুবই কম। কারণ, শিবিরগুলো থেকে উপজেলা হাসপাতালে যাওয়া বেশির ভাগ রোহিঙ্গা পরিবারের জন্যই কঠিন।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ আগস্টের পর থেকে বহির্বিভাগে অপুষ্টির শিকার ১০৫টি ও অন্তবিভাগে ১৫টি শিশুর চিকিৎসা হয়েছে। আর টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগে নয়টি ও অন্তবিভাগে মাত্র দুটি শিশুর চিকিৎসা হয়েছে। এর বাইরে এমএসএফ চিকিৎসা কেন্দ্রেও অপুষ্টির শিকার শিশুদের চিকিৎসা হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, অপুষ্টির শিকার শিশুদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন ঘরে তৈরি মানসম্মত শিশু খাবার। কিন্তু সে ব্যবস্থা রোহিঙ্গা তাবুতে নেই। তাই অপুষ্টি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

Leave a Reply

Top