You are here
Home > দূরনীতি ও অপরাধ > রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার

স্টাফে রিপোর্টারঃ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অভিযানরত নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে গতকাল শুক্রবার এক দিনেই নিহত হয়েছে ৭১ জন, যাদের মধ্যে ৫৯ জনই রোহিঙ্গা মুসলিম, অবশিষ্ট ১২ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য। গত বছর অক্টোবরে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযানের পর বছর না ঘুরতেই আবারো রোহিঙ্গা নিধন শুরু করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকালের হামলা শুরু হতেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে শত শত রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য বর্তমানে যার নাম রাখাইন রাখা হয়েছে সেখান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা-নির্যাতন শুরু হয় সত্তরের শতকের শেষ দিকে। মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী ও চরমপন্থী বৌদ্ধদের জুলুম-নির্যাতনে সেখান থেকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখনো প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনে জুলুম-নির্যাতনের মধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাস করছে। রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী বলে গণ্য করছে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু এত কিছুর পরও মিয়ানমার সরকারের আচরণের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তাদের ওপর নির্যাতনের নতুন নতুন খড়গাঘাত দিন দিন বাড়ছে।

গত বছর সেনাবাহিনীর দমন অভিযানে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আর গত কয়েক বছরের দাঙ্গায় রাখাইন ও পাশের কাচিন রাজ্যে এক লাখ ২০ হাজারের মতো লোক উদ্বাস্তু হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা মুসলিম। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না দেশটির সরকার। ভোটাধিকারসহ সব নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের। প্রতিনিয়ত চলছে একের পর এক দমন-পীড়ন।

উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে যে রোহিঙ্গাবিরোধী দাঙ্গা শুরু করা হয় সেই সূত্র ধরে দেশটির রাষ্ট্রীয় বাহিনী নির্যাতনের স্টিমরোলার পাঁচ দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। সেনাবাহিনী পাঠিয়ে নিজ দেশের জনগণের ওপর এমন নিধন অভিযান ইতিহাসে বিরল। রোহিঙ্গাদের বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী। দশকের পর দশক ধরেই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এ ঘটনা। মিয়ানমারের ১৩৫টি আদিবাসী জাতিগত গ্রুপের তথ্য সরকারি খাতায় লিপিবদ্ধ করেছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের স্থান হয়নি। তারা শত শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় মিয়ানমারে বাস করে এলেও কর্তৃপক্ষ তাদের অবৈধ অভিবাসী বিবেচনা করে।

মিয়ানমারে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে কাজ করে উগ্র বৌদ্ধদের অনেকগুলো গ্রুপ। ২০১৫ সালে মিয়ানমার সেন্টার ফর রেসপনসিবল বিজনেসের এক জরিপে দেখা যায়, অনলাইনে ঘৃণাসংবলিত যেসব পোস্ট দেয়া হয় তার ৯০ ভাগই মুসলিমদের টার্গেট করে দেয়া। সামান্য অজুহাতেও এখানে মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উগ্র বৌদ্ধরা। ইয়াঙ্গুনে বোরকা পরা এক মুসলিম নারী দ্য ইকোনমিস্টের সাংবাদিককে জানান, ‘আমাদের সাথে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো আচরণ করা হচ্ছে। আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়। একটি সাধারণ ঘটনাও দাঙ্গায় পরিণত হতে পারে।’

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাখাইনে ৪ জুলাই একটি নৌকা কেনা নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে একদল বৌদ্ধ এক রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে। মুসলিমদের বাড়িঘর, মসজিদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সাম্প্রতিক সময়েও অনেক হামলা হয়েছে। ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নির্যাতন চালানো হয়। এতে প্রায় ২০০ জন নিহত হয়। আর গত বছরের তাণ্ডবে তো সরাসরিই ভূমিকা রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

জাতিসঙ্ঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ বলছে, সৈন্যরা ভয়াবহ মাত্রায় ধর্ষণ, খুন ও রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে। জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন মনে করে, সৈন্য পাঠিয়ে নয়, দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে আন্তরিক হওয়া উচিত মিয়ানমার সরকারের। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অনেক দিন ধরেই কোনো সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, ত্রাণকর্মী এমনকি কূটনীতিকদেরও যেতে দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। জাতিসঙ্ঘ ওই এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্তে আগ্রহী হলেও মিয়ানমার তাদের সহায়তা করছে না।

মিয়ানমার জনসংখ্যার প্রায় ৯০ ভাগ বৌদ্ধ। সন্ন্যাসীত্বপ্রাপ্ত বা সঙ্ঘের সদস্য হওয়াটা দেশটিতে বেশ জনপ্রিয়। তাদের প্রায় পাঁচ লাখ তথা জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশই সন্ন্যাসী। রোহিঙ্গাবিরোধী দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছে তাদের মাধ্যমেই। দেশটির রাজনীতিতেও এই সন্ন্যাসীদের ব্যাপক প্রভাব। কোনো সরকারই সন্ন্যাসীদের মতামতকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাই তো সামরিক শাসন থেকে বেরিয়ে এলেও দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি তথা রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই হচ্ছে না।

Leave a Reply

Top