রাখাইনে সঙ্ঘাতের পেছনে ভয়ঙ্কর কারণ – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > আন্তর্জাতিক > রাখাইনে সঙ্ঘাতের পেছনে ভয়ঙ্কর কারণ

রাখাইনে সঙ্ঘাতের পেছনে ভয়ঙ্কর কারণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : একজন শীর্ষস্থানীয় ফরাসি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ বলেছেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মায়ানমারের রাখাইনে গণহত্যা-জাতিগত নিধনের পেছনে ইসলামবিদ্বেষের চেয়ে অনেক বেশি রোহিঙ্গাবিদ্বেষ কাজ করছে।জাতিসঙ্ঘের হিসাবে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৮৯ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা এখনো মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুদেরকে হত্যা, তাদের বাড়িঘরে লুটপাট এবং রোহিঙ্গা গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া অব্যাহত রেখেছে, আর সে কারণে এখনো বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আগমনের ঢল অব্যাহত রয়েছে।

ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের জ্যাকস লেইডার এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে আনাদোলুকে বলেছেন, ‘এ ঘটনাটির পেছনে ইসলামবিদ্বেষের চেয়ে অনেক বেশি রোহিঙ্গা জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করছে। এ কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে রাখাইনে ভয়াবহ সহিংসতা চলা সত্ত্বেও দেশটির অন্য কোথাও কোনাে সহিংসতার ঘটনা বা প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনা ঘটেনি।’ তিনি বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত ঘটনাবলিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্ব আগের চেয়ে আরো বেশি প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে। মেরুকরণের ধারণা মনে হচ্ছে অনেক বেশি কার্যকর ও ‘দৃঢ় নিরাপত্তাদায়ক’। তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে মায়ানমার এমন বিষয়টির পক্ষে কথা বলছে যার কোনো যুক্তি নেই। কারণ তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। আর ভেতরে ভেতরে সেখানকার বৌদ্ধ সম্প্রদায় মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোটবদ্ধতাকে নিজেদের জন্য হুমকি বলে গণ্য করছে।’

এই ফরাসি ঐতিহাসিক এ সঙ্ঘাতের পেছনে ঔপনিবেশিক পটভূমির কথা তুলে ধরে বলেছেন, ওই বিষয়টি সবাই পুরোপুরি ভুলে গেছে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বৌদ্ধদের সাথে মুসলিমদের জনসংখ্যাগত পার্থক্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে, অথচ এ বিষয়টিই সেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধির চালক হিসেবে কাজ করেছে।’

নাগরিকত্বের অধিকার হরণ
জ্যাকস লেইডার বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে ১৯৭০-এর দশক থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তাদের নাগরিকত্বের অধিকার হরণ ছিল তারই অংশ বৈ কিছু নয়।’ এ ছাড়া একতরফা প্রচারণা চালানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দোষারোপ করেন। লেইডার বলেন, ‘বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম (পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের) এ ঘটনার ঐতিহাসিক জটিল দিকটির প্রতি নজর দিতে আগ্রহী নয়; বরং তারা কেবল রোহিঙ্গা বলে পরিচিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানবিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরছে। তাই এসব মিডিয়ার মূল বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সম্প্রীতি না হয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি সুবিচার করার বিষয় প্রকাশ পেয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর যে সাম্প্রদায়িক শান্তির চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে কখনোই বৌদ্ধ-মুসলিম সম্পর্ক ভালো ছিল না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ সঙ্ঘাতকে কেবল সরলভাবে দুটো দিককে দেখানো হয়েছে, তা হলো বর্ণবাদী বৌদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থানীয়দের সমর্থন ও সহযোগিতায় অসহায় মুসলিমদের ওপর পৈশাচিক নিপীড়ন ও গণহত্যা চালাচ্ছে। অথচ জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার এটি একটি দিক মাত্র।’

ফরাসি ইতিহাসবিদ বলেন, যত দিন পর্যন্ত এ জটিল সঙ্ঘাতের বিষয় ঠিকমতো প্রকাশ না পাবে তত দিন সেখানকার অবস্থার পরিবর্তন হবে না। তাই পাঁচ দশক ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সাধারণ ও নৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার মুসলিমদের পক্ষাবলম্বন করলেও পরিস্থিতির কোনোই পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘এ ফলাফলের কারণে মায়ানমার বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে এবং এখনো রোহিঙ্গাদের ভেতর থেকে কোনো সমর্থন পাচ্ছে না।’

ত্রাণ সহায়তা দানে তুরস্কের প্রচেষ্টা
লেইডার বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কার কারণে মায়ানমার সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করাকে তাদের মূল কাজ বলে মনে করে ধর্মীয় নয় বরং ভূরাজনৈতিক কারণে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। তিনি মায়ানমারে তুরস্কের ত্রাণ সহায়তার প্রসঙ্গে বলেন, এমন ক্ষেত্রে কাজ করার তুরস্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুরস্ক ও মিয়ানমার শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপের ঐতিহাসিক সহনশীল সহাবস্থানের বিষয় প্রত্যক্ষ করেছে। অবশ্য এই মহৎ ঐতিহ্য মিথ্যা প্রতিপন্ন করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে উভয় দেশের। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যাতে আরো খারাপের দিকে না যায় সে জন্য তুরস্ক মায়ানমারকে বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হবে।

জাতিসঙ্ঘ রোহিঙ্গাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী বলে অভিহিত করেছে। ২০১২ সালের হামলায় অসংখ্য রোহিঙ্গাকে হত্যার পর থেকেই তারা সাম্প্রদায়িক হামলার হুমকির মধ্যে ছিল। গত অক্টোবরে মংডুর সীমান্ত চৌকিতে হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনী পাঁচ মাসব্যাপী দমন-পীড়ন চালায়। সেই সময় চার শতাধিক লোককে হত্যা করা হয় বলে রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো জানায়। জাতিসঙ্ঘের রিপোর্টে নিরাপত্তার বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ, নারী-শিশু-কিশোরসহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, বর্বর প্রহার ও গুম করার তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, এসব অপরাধ ও জাতিগত নিধন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট মিয়ানমারের প্রতি ফের চীনের সমর্থন

রয়টার্স ও হিন্দুস্তান টাইমস

রাখাইনে সরকারি বাহিনী ও বৌদ্ধদের চলমান পৈশাচিক জাতিগত নিধনযজ্ঞকে ফের সমর্থন করল চীন। গতকাল শনিবার চীনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তার ভাষায় মায়ানমার সরকার রাখাইনে স্থিতিশীলতা রক্ষার চেষ্টা করছে। অথচ সেনাদের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহে সেখানকার প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের নৃশংসতাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত বুধবার বলেন, রাখাইনে নির্মম দমন-পীড়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে দায়ী করছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক দফতরের উপপ্রধান গুয়ো ইয়েঝাউ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে গতকাল বলেন, চীন রাখাইনে হামলার নিন্দা করছে এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মায়ানমার সরকারের চেষ্টাকে উপলব্ধি ও সমর্থন করছে।

দীর্ঘদিনে বন্ধুত্ব
তিনি বলেন, চীন ও মায়ানমারের মধ্যে গভীর ও দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব রয়েছে এবং বেইজিং বিশ্বাস করে যে, মায়ানমার নিজেই তার এ সমস্যা মোকাবেলা করতে পারবে। পশ্চিমাদের থেকে ভিন্ন ভাবে চীন কেন রোহিঙ্গা সঙ্কটকে দেখছে, প্রশ্নের জবাবে গুয়ো বলেন, চীনের নীতি হচ্ছে, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখুন, অন্য দেশের হস্তক্ষেপের কারণে কী পরিণতির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এটি করব না। তবে হস্তক্ষেপের কারণে অঘটন ঘটেছে এমন কোনো দেশের উদাহরণ তিনি তুলে ধরেননি। গুয়ো বলেন, চীন সীমান্ত সংলগ্ন মায়ানমারে অস্থিতিশীলতা চায় না। আমরা সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছি। গুয়োর দফতর মায়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সাথে সম্পর্ক রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ক্ষমতায় আসার পর সু চি চীন সফর করেন।

লাখ লাখ রোহিঙ্গার পলায়ন
মিয়ানমার সেনাবাহিনী হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের কারণে কয়েক সপ্তাহে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও মায়ানমারের, বিশেষ করে দেশটির জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয় বিবেচনা করছে।

Leave a Reply

Top