যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও শেখ মুজিব শাসনামলের মূল্যায়ন – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > কবিতার খেরোখাতা > যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও শেখ মুজিব শাসনামলের মূল্যায়ন

যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও শেখ মুজিব শাসনামলের মূল্যায়ন

মিথিলা আকন্দ :

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহীনির আত্ম সমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ১১ই জানুয়ারী। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিব নগরে ঘোষিত স্বাধীনতা সনদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহন করেন। সর্ব প্রথম তিনি ১১-০১-১৯৭২ তারিখে অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারির মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শাসনামল শুরু হয়।

সদ্য স্বাধীন এ বাংলাদেশের দায়িত্ব ভার যখন তিনি গ্রহন করেন তখন এদেশ একটি অচল, বিপর্যস্ত – বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি এ অচল অবস্থা দূর করার জন্য দেশ পুনর্গঠনের পদক্ষেপ হাতে নেন। তার ধারাবাহিকাতায় পুনর্বাসনের এক বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শুরু করেন দেশের শাসনকার্য। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা, দেশের অভ্যন্তরে ৪৩ লক্ষ যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাস গৃহ পুনঃনির্মাণ করা। এদের খাদ্য সরবরাহ করা তখন সরকারের বিরাট দায়িত্ব। সে সময় প্রশাসনিক কাঠামো ছিলো দুর্বল। স্থানীয় পরিষদ গুলো তখনো পাকিস্তানিদের দখলে। আন্তর্জাতিক ত্রান সামগ্রী লাভ করলেও এমন দুর্বল প্রশাসন দিয়ে তার সুষ্ঠ বণ্টন সম্ভব ছিলোনা। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রেডক্রস সোসাইটিকে জাতীয় পর্যায় থেকে নিম্নতর স্তর পর্যন্ত পুনর্গঠন করেন। শুরু করেন জেলা পর্যায়ে ত্রান কমিটি গঠনের রূপরেখা। আয়তন ও লোক সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ৫ থেকে ১০ সদস্যের ত্রান ও পুনর্বাসন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গুলো সারা দেশে ত্রান সামগ্রী বিতরণ করে।

১৯৭৩ সালের ৪ মার্চ সংবাদপত্রে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের ক্রোড় পত্রে দাবি করা হয় ধ্বংস প্রাপ্ত ৯ লক্ষ ঘর বাড়ি পুনঃনির্মাণ করেছে। সামগ্রীক পুনর্বাসন কর্মকান্ডে ব্যয় করেছে ৭২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীনতার প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে জাতীয় করণ আইন পাস করে। এ জাতীয় করণ নীতিতে ১২টি ব্যাংকে সমন্বয় করে ৬টি ব্যাংকে রূপান্তর করে। ১৯৭২ সালের ১নং আদেশ ও ১৬ নং আদেশের আওতায় অবাঙ্গালী তথা পাকিস্তানী মালিকানার ৮৫% কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে রাষ্ট্র সে গুলোর মালিকানা দখল করে।

বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতা গ্রহণের সময় ৮৫% লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিলো। এজন্য তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে” এ স্লোগান কে সামনে রেখে তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। পরিবার পিছু ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা সিলিং নির্ধারণ করেন। হ্রাসকৃত মুল্যে ৪৮ হাজার শক্তি চালিত লো লিকট পাম্প, ২৯০০ গভীর নলকূপ, ৩০০০ অগভীর নলকূপ ব্যবস্থা করেন। ১৬১২৫ টন ধান বীজ, ৪৫৪ টন পাট বীজ এবং ১০৩৭ টন গম বীজ বিতরণ করেন। কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য ধার্য করেন। কৃষি গবেষণার গুরুত্ব অনুধাবন করে কৃষি বিষয়ক উচ্চ শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের মধ্যেই ১০০টি খাদ্য গুদাম তৈরি করেন। কৃষকের মধ্যে ১লক্ষ বলদ, ৫০ হাজার গাভী, ৩০ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেন। কৃষক দরদী এ মহান নেতার এরূপ নানা পদক্ষেপে এদেশের কৃষিতে শক্তিশালী জোয়ার আসে।

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষার উপর জাতীয় অগ্রগতি নির্ভরশীল। তাই তিনি ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ডঃ কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এ কমিশন দেড় বছর কঠোর পরিশ্রম করে একটি রিপোর্ট প্রদান করেন। তবে বঙ্গবন্ধু সে রিপোর্ট পাওয়ার আগেই মার্চ’৭১ থেকে ডিসেম্বর’৭১ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বকেয়া টিউশান ফি মওকুফ করেন। দেশের সম্পদের অপ্রতুল্যতা সত্ত্বেও শিক্ষকদের নয় মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ সহ পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে সরকারী করণের ফলে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি সরকারী হয়। তিনি ৯০০টি কলেজ ভবন ও ৪০০টি উচ্চ বিদ্যালয় পুনঃনির্মাণ করেন। অফিস আদালতে বাংলা প্রচলনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বাংলা একাডেমীতে সাঁট লিপি, মুদ্রাক্ষর ও নথী লেখার প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করেন।

বঙ্গবন্ধু কৃষক ও কৃষির প্রতি যেমন দরদী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তেমনি অর্থনৈতিক সংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। উনার পাঁচশালা পরিকল্পনা তারই অংশবিশেষ। পাঁচশালা পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিলো বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনায় বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা ৬২% থেকে ১৯৭৭-৭৮ এর মধ্যে ১৭% এ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। তিনি জুট, সুগার, টেক্সটাইল ও গ্যাস আন্ত অয়েল মোট চারটি কর্পোরেশন গঠন করেন। শিল্প ঋণ সংস্থা শিল্প ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ১০৫০টি নতুন শাখা স্থাপন করেন। কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে ৩৩৫টি শাখা স্থাপন করেন। মুদ্রা চালু করেন। নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠনের জোর প্রয়াস চালান। বঙ্গবন্ধু যে সময় শাসনভার গ্রহন করেন সে সময় সরকারী কোষাগার থেকে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন দেওয়াই সম্ভব ছিলোনা, তথাপি তিনি নতুন বেতন কাঠামো ও পহেলা মে তে শ্রমিকদের মজুরি হার বৃদ্ধির ঘোষণা দেন।

মুক্তি যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৭৪ সালে সে সব পুনঃনির্মাণ সহ ৯৭টি নতুন সড়ক সেতু নির্মাণ করেন। ১৯৭২ সালের ৭ মার্চের মধ্যে ঢাকা – চট্টগ্রাম, ঢাকা – সিলেট, ঢাকা – যশোর ও ঢাকা – কুমিল্লা রুটে বিমান চালুর ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৩ সালের ১৮ই জুন ঢাকা – লন্ডন রুটে বাংলাদেশ বিমানের প্রথম ফ্লাইট চালু হয়। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কোস্টার সহ ১৪টি সমুদ্রগামী জাহাজ এবং ৫৫০০০ টেলিফোন ব্যবস্থা চালু করেন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের তিন দিনের মধ্যে মদ, জুয়া, হাউজি, ঘোড়া দৌড় নিষিদ্ধ করেন। নারিদের কল্যাণে “পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন” সৃষ্টি করেন। তিনি মুক্তি যোদ্ধাদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন, পাশা পাশি শহিদ পরিবার কে আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা প্রচলন করেন। সাভার ও মেহেরপুর স্মৃতি সৌধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করেন। মুক্তি যুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সেনাপতি কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী কে জেনারেল ও কর্নেল আব্দুর রব কে মেজর জেনারেল পদে ভূষিত করেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে বি ডি আর গঠনের আদেশ জারি করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সারা দেশে বিদ্যুৎ সাব ষ্টেশন গুলো ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিলো। তিনি ৫০০০ বিদ্যুৎ পোল আমদানি করেন এবং ১৯৭২ সালের মধ্যে ১৫০০ কিঃমিঃ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০ মেগাওয়াট থেকে ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নিত করেন।

বাংলাদেশের স্থপতি এ মহান নেতা শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা বা দেশের নেতৃত্বই গ্রহণ করেননি তার সু-দক্ষ পরিকল্পিত নেতৃত্বদানে আমাদের উপহার দিয়েছেন একটি পুনঃগঠিত বাংলাদেশ। এত কিছুর মধ্য দিয়েও উনার গৃহীত অনেক পরিকল্পনায় বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। উনার শাসনকাল ছিলো মাত্র তিন বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এ মহান নেতাকে স্ব – পরিবারে হত্যা করা হয়। জীবিত থাকলে হয়তো উনার নেতৃত্বের অনুসরণে এ দেশ আরো অনেক এগিয়ে যেত। মাত্র তিন বছরের শাসন ব্যবস্থায় একটি সম্পদ হীন ধ্বংস স্তূপকে যে রূপ তিনি দান করেছিলেন তা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।।
এই মহান নেতাকে আজ স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধায়।

2 thoughts on “যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও শেখ মুজিব শাসনামলের মূল্যায়ন

Leave a Reply

Top