You are here
Home > আন্তর্জাতিক > মিয়ানমারে নিহত সহস্রাধিক : জাতিসঙ্ঘ

মিয়ানমারে নিহত সহস্রাধিক : জাতিসঙ্ঘ

দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসার সময় অর্ধাহারে-অনাহারে শিশুসন্তান কোলে মৃতপ্রায় এক রোহিঙ্গা নারী। ছবিটি নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা সীমান্ত থেকে তোলা

স্টাফ রিপোর্টারঃ মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাণ্ডবে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তাদের মধ্যে মুসলিম রোহিঙ্গার সংখ্যাই বেশি। মায়ানমার সরকারের প্রকাশিত নিহত মানুষের সংখ্যার চেয়ে এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। গতকাল শুক্রবার জাতিসঙ্ঘের মায়ানমারবিষয়ক মানবাধিকার প্রতিনিধি ইয়াংহি লি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এসব কথা বলেন। ওই কর্মকর্তা মায়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে এ ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ বলেছে, গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের থাকার মতো যথেষ্ট জায়গা হচ্ছে না। প্রত্যদর্শী লোকজনের বরাত দিয়ে ইয়াং হি লি বলেছেন, ‘এর মধ্যে এক হাজার বা তারও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে।’

বাংলাদেশ সর্বশেষ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে বাংলাদেশ ৬ লাখ ৭০ হাজার মায়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বলেছে, রাতভর পালিয়ে আসার কারণে এর আগে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা গণনা করা হয়নি। এর আগে জাতিসঙ্ঘের হিসাবে অনুপ্রবেশকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, গত বুধবার অন্তত ৩০০ নৌকায় করে মিয়ানমারের বিপুলসংখ্যক নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করায় এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রবল স্রোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে। তাদের বেশির ভাগ শিশু।

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার পুলিশের বেশ কয়েকটি তল্লাশিচৌকি এবং সেনাঘাঁটিতে হামলার অভিযোগে রাখাইনে সামরিক অভিযান শুরু করে মায়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে অন্তত ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ক্ষমতাসীন সু চির সরকার। এদিকে কক্সবাজার থেকে জি এ এম আশেক উল্লাহ, কক্সবাজার (দক্ষিণ) থেকে গোলাম আজম খান ও উখিয়া থেকে হুমায়ুন কবির জুশান জানান, মায়ানমারের জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলমানদের ১০ হাজারেরও বেশি শিশু চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই সপ্তাহ অভুক্ত থেকে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে অন্তত ১৫০টি শিশু। প্রসূতি মা মারা গেছে কমপক্ষে ১০ জন। মৃতের এ সংখ্যা বেড়েই চলছে। কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতাল ও সীমান্তের বিভিন্ন মেডিক্যাল টিম সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এ দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যানের কাজ শুরু হচ্ছে। একই সাথে তাদের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে একত্র করে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ জন্য বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ পদ্ধতিতে তাদের নাম নিবন্ধন করা হবে।

অর্ধাহারে-অনাহারে দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে খাদ্যসঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে। ক্ষুধার্ত মা শিশুকে বুকের দুধ দিতে না পারায় হাড্ডিসার অবস্থা রোহিঙ্গা শিশুদের। এই বিপুল রোহিঙ্গার খাদ্যসঙ্কট ও তাদের শিশু ও প্রসূতিদের মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে অনেকেই। মায়ানমার সীমান্তবর্তী বংলাদেশের তিন উপজেলা টেকনাফ, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ির সড়ক মহাসড়ক কিংবা গ্রামের পথে পথে এখন রোহিঙ্গাদের স্রোত। তারা প্রতিদিনই রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাদায় একাকার হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছেন। তাদের সাথে থাকা শিশুরা অনাহারে-অর্ধাহারে কংকালসার হয়ে পড়েছে। মায়েরা অভুক্ত থেকে দীর্ঘ পথ হেঁটে বাংলাদেশে আসছেন। ফলে তাদের অবস্থাও গুরুতর। এ কারণে তারা শিশুকে বুকের দুধ দিতে না পারায় হাড্ডিসার অবস্থা শিশুদের। শত শত শিশুর শরীর জ্বরে পুড়ছে। কিন্তু কোলে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া করার কিছু নেই হতভাগা মায়েদের।

তা ছাড়া পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, আমাশয়, নিমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন চর্মরোগেও আক্রান্ত শিশুরা। নানা কারণেই বাড়ছে রোহিঙ্গা শিশু মৃত্যুর হার। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৫০টি শিশু ও ১০ জন প্রসূতি মা মারা গেছে। অনেক গর্ভবতী নারী সীমান্তের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অসময়ে সন্তান প্রসব করেছেন। নতুন আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ঠিকমতো চিকিৎসা করার সুযোগ নেই। কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের খাদ্যসঙ্কট মোকাবেলার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করছেন।

শরণার্থী শিবিরের এনজিও কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের জনবলের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা শরণার্থী শিবিরের কাছাকাছি অবস্থান করছেন তারা দেরিতে হলেও চিকিৎসা পাচ্ছেন। কিন্তু যারা সীমান্তবর্তী গ্রামে এবং জিরো পয়েন্টে অবস্থান করছেন, বিনা চিকিৎসায় তাদের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে। রোহিঙ্গারা জানান, ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো ত্রাণ দেয়ার পাশাপাশি যদি ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম গঠন করে চিকিৎসা দেয় তবে অসুস্থ রোহিঙ্গাদের উপকার হবে।

এ দিকে মায়ানমারে সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের নির্মমতা থামার কোনো লক্ষণ নেই। প্রতিদিনই আরাকানের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কোনো কোনো গ্রামে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে। শত শত ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে তাই রোহিঙ্গারা খাল বিল নদী পার হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে জড়ো হচ্ছেন। বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পার হতে গিয়েও তারা লাশ হচ্ছেন। রাতে নৌকায় পালিয়ে আসার সময় প্রতিদিনই নৌকাডুবি হচ্ছে। নাফ নদী কিংবা টেকনাফ সমুদ্র উপকূলে প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের লাশ ভেসে আসছে।
কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তজুড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাঁবু টাঙ্গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ পাশের এলাকায় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। হাজার হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে তীব্র খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে। খাদ্যের জন্য তারা রাস্তায় বসে আছেন। কোনো গাড়ি দেখলেই ছুটে আসেন। কোনো গাড়ি থেকে শুকনো খাবার দিতে দেখলে তা সংগ্রহ করতে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। এই প্রযোগিতায় বৃদ্ধ ও শিশুদের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন শাহপরীর দ্বীপে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের মধ্যেও খাদ্যসঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বীপের সাবরাং ইউনিয়ন সচিব শেখ ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, গত ২৫ আগস্ট থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শাহপরীর দ্বীপে আসছেন। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। দ্বীপের বাসিন্দা আবদুল হক জানান, রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশায় সহমর্মিতা ও সহানুভূতি দেখিয়ে দ্বীপের মানুষ যতটুকু সম্ভব সহায়তা করেছেন। এমনকি ফ্রিজে রাখা কোরবানির গোশত রান্না করে অনেকেই অভুক্ত রোহিঙ্গাদের দিয়েছেন। বস্ত্রহীনদের কাপড় দিয়েছেন। গাড়িভাড়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে এই দ্বীপে চরম খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে। চাল-ডাল, তেল, তরিতরকারীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য এখন আকাশছোঁয়া। এক কেজি আলুর দাম ৫০ টাকার ওপরে চলে গেছে।

উখিয়ার পালংখালী বাজারে দোকানে দোকানে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের খাবার চাইতে দেখা গেছে। ছেনোয়ারা বেগম (২৬) নামে এক রোহিঙ্গা নারী কোলে দুই সন্তান নিয়ে এই বাজারের হোটেল আল মদিনায় ভাত চান। তার সাথে বৃদ্ধ শ্বশুর আবদুুর রাজ্জাক। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হোটেলের মালিক সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো: হোসেন ওই নারীকে একটি পলিপ্যাকে ভাত ও গোশত দেন। ছেনোয়ারা বলেন, আমরা পরিবারের ১২ জন পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। রাস্তায় আছি এখনো। বৃষ্টি হলে গাছের নিচে বসে থাকি। পথে কথা হয় ফরিদা বেগম (৪৫) নামে এক নারীর সাথে। তার স্বামীর নাম মৃত গোরা মিয়া। তারা মায়ানমারের মংডুর বলিবাজার এলাকায় থাকতেন। তার চার ছেলে ও তিন মেয়ে। সবাইকে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, এর আগে ১৪ দিন আমরা নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ছিলাম। তার মেয়েদের ধর্ষণ করেছে মায়ানমারের সেনারা। ছেলেদের হত্যা করেছে। বালুখালীর পাহাড়ে ফরিদা বেগম পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে একটি ছোট্ট টঙঘর বানিয়েছেন। বুধবার তিনি ভাত খেয়েছেন এরপর আর কিছু খাননি। ওই পাহাড়েই আশ্রয় নিয়েছেন শাহানূর বেগম নামে এক নারী। তিনি বলেন, তার স্বামী ইউনুছ আলীকে সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করেছে।

উখিয়ার কলাবাগানে আশ্রয় নেয়া মাছুমা বেগম রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার ছেলেমেয়ে ৯ জন। খাবার সংগ্রহের জন্য তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। খাইরুন নেসা (৪০) নামে এক নারী বলেন, তার স্বামীর নাম হোসেন জোহুর। গাছের ব্যবসা করতেন। এখন আর কিছুই নেই। এক কাপড়ে চলে এসেছি। প্রায় ১৫ দিন ধরে এক কাপড়েই আছি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কথা উল্লেখ করে সেনোয়ারা বেগম নামে আরেকজন বলেন, আমাদের বাড়ির ওপরে হেলিকপ্টার উড়েছে। এরপর আগুন দিয়েছে। তারপর গুলি করছে সবাইকে। তার বাবা-মা ও পাঁচ ভাইবোন সবাই গুলিতে মারা গেছে। পালংখালী এলাকার আলমগীর আলম নিসা নামে এক তরুণ বলেন, এখন করুণ অবস্থা দেখে অনেকেই এগিয়ে আসছেন। কিন্তু এত লোককে কে কত দিন খাবার দেবে। এত মানুষ কী খেয়ে বেঁচে থাকবে? শিশু ও বয়স্করা না খেয়ে ক’দিন থাকতে পারবে? এই এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। সবাই খেটে খায়। তার ওপর লাখ লাখ মানুষ আসায় এই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারাও এখন বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাচ্ছেন না।

কক্সবাজারে আইওএমের কর্মকর্তা সংযুক্তা সাহনী জানান, মায়ানমারে নির্যাতিত মুসলমানেরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পাশাপাশি নো ম্যান্স লান্ডে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এসব মানুষের জীবন বাঁচানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, এ সমস্যা এখন আর বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে উদ্যোগও নিচ্ছে। উল্লেখ্য, ২৪ আগস্ট রাতে মায়ানমারের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনার পর থেকে দেশটির আরাকান রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হয়। ইতোমধ্যে রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত তিনটি জেলায় পাঁচ হাজার বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং তিন হাজার রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এ সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

আরো ২টি লাশ উদ্ধার : কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদী থেকে ২ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মাইন উদ্দিন খান জানান, রাতে নাফ নদী থেকে ২ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার হয়েছে। স্থানীয়দের সহায়তায় লাশ দু’টি দাফন করা হয়। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে কক্সবাজারে অন্তত ৮৮ জন রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়ার বালুখালী সীমান্তে মিয়ানমার থেকে মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়ে আসা ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে ২২০ জন রোহিঙ্গাকে মায়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ডের শাহপরীর দ্বীপ স্টেশন কমান্ডার লে. ফয়সাল জানান, মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে পাঁচটি বোটকে মায়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। এসব বোটে ২২০ জন রোহিঙ্গা ছিল।

বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নাম তালিকাভুক্ত হবে : বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যানের কাজ শুরু হচ্ছে। একই সাথে তাদেরকে নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে একত্র করে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ পদ্ধতিতে নিবন্ধন করা হবে। এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের একত্র করে এক জায়গায় রাখার প্রক্রিয়াও একই সাথে চলছে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের মুখপাত্র অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, উখিয়া টেকনাফের ১৭টি পয়েন্টে শিগগির এই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের তালিকাভুক্তির কাজ শুরু হবে। তিনি জানান, আগে যারা এসেছেন এবং বর্তমানে যারা আসছেন তাদের সবাইকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং এই তালিকভুক্তির কাজ সম্পন্ন করার জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এ দিকে ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা আগমনের ফলে সীমান্তে নানা অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধ করার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। এ জন্য সীমান্ত এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রধান করে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। সীমান্তে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পণবন্দী করে টাকা আদায়ের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত গত দুই দিনে ৯ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। অপর দিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বিজিবির ডাকে শুক্রবারও সাড়া দেয়নি মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিপি। বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল আহসান খান জানান, ২৫ আগস্টের পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বিবিজির পক্ষ থেকে বিজিপিকে অনেকবার মেসেজ পাঠানো হয়েছে, কিন্তু কোনো যোগাযোগই করছে না তারা।

গুলিবিদ্ধ ২ রোহিঙ্গার মৃত্যু : হুমায়ুন কবির জুশান উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে জানান, উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের এফ ব্লকে নতুন করে আশ্রয় নেয়া গুলিবিদ্ধ দুই রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় ক্যাম্পের এফ ব্লকের মাঠে ২ রোহিঙ্গার নামাজে জানাজা শেষে তাদেরকে দাফন করা হয়েছে। তারা হলেন মংডু নারাইশং এলাকার চেয়ারম্যান (উক্কাট্টা) আসদ আলী (৪০) ও টং বাজার এলাকার আলি আকবর (৫৫)।
নিহত আলি আকবরের ছেলে ছৈয়দুজ্জামান জানান, মিয়ানমারের সেনাদের গুলিতে তারা আহত হলে কাঁধে করে এপাড়ে এনে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলে গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় তার বাবা ও বেলা ২টায় চেয়ারম্যান আসদ আলির মৃত্যু হয়।

নাফ নদীর পাড়ে জন্ম নিলো যমজ দুই সন্তান : বাড়ি থেকে পালানোর ৭ দিন পর নাফ নদী পার হয়ে এপাড়ে ওঠার পর পরই প্রসব বেদনায় ঢলে পড়ি। দীর্ঘ চার ঘণ্টা প্রসববেদনা সহ্য করে প্রথম সন্তানের মা হলাম, একবারেই পেলাম দুই যমজ সন্তান। উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন মিয়ানমারের বলিবাজারের গর্জনবিল গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা খালেদা বেগম (১৭)। নাফ নদীর পাড়েই তার যমজ শিশু দু’টির জন্ম। ৭ দিন আগে জন্ম নেয়া দুই নবজাতকসহ সেই পরিবার আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং রাস্তার পাশে এক ঝুপড়িতে। অনাহারেই দিন কাটছে তাদের। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কুতুপালং ঝুপড়িতে কথা হয় ওই নবজাতকের বাবা আহমদ উল্লাহর সাথেও। তিনি বলেন, কোরবানির ঈদের দিন রাত ১২টার দিকে নাফ নদীতে নৌকার ওপর তার স্ত্রীর প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে ছটফট করতে থাকে। তখন নৌকায় শুধু একজন নারী ছিলেন, বাকিরা সবাই পুরুষ। তখন উপায় না দেখে স্ত্রীকে আমি নিজেই সহযোগিতা করি। খালেদা বেগম বলেন, এরা আমার প্রথম সন্তান। তাও আবার দুটিই ছেলে। এখনো নাম রাখিনি। যেহেতু ঈদের দিন জন্ম হয়েছে তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোরবান আলি নাম রাখব। হাসিমুখে তিনি আরো জানান, সন্তানের চেহারা দেখে তিনি মায়ানমারের সেই করুণ স্মৃতি ভুলে গেছেন।

৫ দিন ধরে মাকে কাঁধে নিয়ে এপাড়ে অছিউর : মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন পাহাড় জঙ্গল, ঝোপঝাড় পেরিয়ে মিয়ানমারের সীমান্তরী বাহিনী বিজিপির চোখ ফাঁকি দিয়ে পাঁচদিন ধরে মাকে কাঁধে নিয়ে হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন মিয়ানমারের মন্ডু সবরদি বিল গ্রামের অছিউর রহমান (৪৪)। তার কাঁধে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মা মমতাজ বেগম। বয়সের কারণে তিনি খুব একটা হাঁটতে পারেন না। তাই ছেলে অছিউর মাকে কাঁধে নিয়ে বয়ে এনেছেন সীমান্তের এপাড়ে। কখনো জঙ্গলে, কখনো পাহাড়ে রাত কেটেছে মা-ছেলের। অছিউর জানান, পরিবারের অন্য সদস্যরা কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশে পাড়ি জমান। তিনি ও তার মা শুধু ছিলেন মায়ানমারে। কিন্তু মায়ানমারে সেনারা যখন একের পর এক গ্রাম পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখন তিনি মাকে কাঁধে নিয়ে পালিয়ে আসেন।

মংডুর পোয়াখালী গ্রামের জমিলা খাতুন (৪৫) জানান, তারা সে দেশের সীমান্ত এলাকার খেয়াবনে কিছু না খেয়ে ৫ দিন আত্মগোপন করেছিলেন। পরে ৭ দিন হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি আরো জানান, তার পাশের বাড়িটি লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে তার বাড়িটিও পুড়ে যায়। একই গ্রামের নিঃস্ব মমতাজ বেগম (৪০) জানান, সেনারা তাদের গ্রামে লুটপাট ও মেয়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন করছে। ছেলেদের ধরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। ছোট ছোট ছেলেদের আগুনে নিক্ষেপ করছে। এ বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ছেলেমেয়ে নিয়ে এখানে চলে এসেছি। তিনি দুঃখ করে বলেন, এত সহায়সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আজ এক কাপড়ে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। স্বামীহারা সাজু বেগম (২৫) জানান, পুলিশ তার স্বামী ইউনুসকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাকে মেরে ফেলে লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। শিশু সন্তান ফায়সাল (৫), রাশেদ (৩) ও আনোয়ারকে (২) নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে এসেছি।

খেয়ারীপাড়ার আব্দুল হামিদ (২৬) জানান, ঘর পুড়িয়ে দেয়ার সময় তার চোখের সামনে বয়োবৃদ্ধ পিতা শফিউল্লাহ (৫৫) মারা যান। উপায়ান্তর না দেখে বাবার লাশ ফেলে মাকে নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছি। নাগপুরা থেকে পালিয়ে আসা আব্দুল গফুর (৪০) জানান, গত সপ্তাহ ধরে মগসেনারা সীমান্তের ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার ও নাগপুরাসহ ২০টি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখনো গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে। মরিয়ম খাতুন (৫৫) জানান, তার সংসার তছনছ করে দিয়েছে মগসেনারা।

‘৯৭ বছরে এমন বর্বরতা দেখিনি’ : নাজির হোসেনের বয়স ৯৭ বছর। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে কখনোই বাংলাদেশে আসতে চাননি। মায়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে তিন ছেলে আগেই বাংলাদেশে এসেছে। তিনি একাই বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু সেনারা তাকে নিজের ভিটেমাটিতে থাকতে দেয়নি। বাধ্য করেছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে। তিনি বলেন, আমার ৯৭ বছর বয়সে এত বর্বরতা দেখিনি।’

‘রোহিঙ্গাদের সব সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে’ : পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে উখিয়ার কুতুপালং এসেছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি জানান, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়ার জন্য কুতুপালং এলাকায় ৫ হাজার একর জমি বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রোহিঙ্গাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে সরকার তাদের সব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করবে। তিনি বলেন, ওরাও মানুষ, আমরা তাদের এমন সময়ে মায়ানমারের ফেরত পাঠাতে পারি না। তাদের প্রতি মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। যত দিন তাদের দেশে ফেরত যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি না হয় তত দিন তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হবে। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

Leave a Reply

Top