You are here
Home > অর্থনীতি > ভ্যাটের ঘাটতি জটিল সমস্যা

ভ্যাটের ঘাটতি জটিল সমস্যা

স্টাফ রিপোর্টারঃ নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইনের বাস্তবায়ন তো স্থগিত হলো। কিন্তু এত বড় বাজেট যে দিলেন অর্থমন্ত্রী, তার কী হবে? ভ্যাট থেকে চলতি অর্থবছরে বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের যে পরিকল্পনা ছিল অর্থমন্ত্রীর, সেটাই বা এখন পূরণ হবে কীভাবে? এসব নিয়ে সমস্যায় আছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সচিবালয়ে গতকাল বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। এই সংগ্রহ এখন কম হবে। ঘাটতিটা কীভাবে মেটানো হবে সেটা খুবই জটিল সমস্যা (ভেরি ক্রিটিক্যাল প্রবলেম)। এখনই কিছু বলতে পারছি না।’
ক্রয় কমিটির বৈঠকের পর সাংবাদিকেরা নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত নিয়ে প্রশ্ন করলেও প্রথমে কোনো কথা বলতে চাননি অর্থমন্ত্রী। বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলব না। আমার কিছু বৈঠক রয়েছে, সেগুলো হওয়ার পরে দেখা যাবে কোথায় কী করতে হবে।’
চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে সরকার ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বলে ঠিক করে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে যদিও কমিয়ে করা হয় ৬৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
* চলতি ২০১৭–১৮ অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা
২০১৬-১৭ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্য ৬৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা
২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভ্যাট আদায় ৫৪ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা
প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সময়ে হওয়া ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন বর্তমানে কার্যকর নয় বলেও জানান আবদুল মুহিত। তিনি জানান, ২০১২ সালে পাস হওয়া ভ্যাট আইনই সংশোধন করে চলছে। প্রতিবছরই তা সংশোধন করা হয়।
জাতীয় সংসদে গত ২৯ জুন চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পাস হওয়ার আগের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।
নতুন ভ্যাট আইনের সমালোচনায় সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের কিছু সাংসদও বাজেট অধিবেশনে খুব সোচ্চার ছিলেন। সংসদের বাইরে প্রায় প্রতিদিন নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের বিরোধিতায় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাও।
অর্থমন্ত্রী অবশ্য গতকাল এ-ও বলেন, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর স্থগিত হলেও ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। কারণ, এটা হচ্ছে ভ্যাট ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ। যে আইনের আওতায় এ ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, সে আইনের আওতায়ই এটা থাকবে।
ভ্যাট আইন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় নতুন করে জাতীয় সংসদ থেকে কোনো পরিকল্পনা পাস করিয়ে আনতে হবে কি না—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুহিত বলেন, এর দরকার না-ও হতে পারে। তবে কিছু বিষয় আইন মন্ত্রণালয়ের দেখার কথা। কাল (আজ বৃহস্পতিবার) আইন মন্ত্রণালয় একটা পরামর্শ দেবে। সংসদে নেওয়া না-নেওয়ার বিষয়টাও তখন দেখা যাবে।
আবার সংসদ অধিবেশন শুরু হবে ৯ জুলাই। ওই অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে এ ব্যাপারে কথা বলবেন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর নতুন ভ্যাট আইনের খসড়া তৈরি, সেই খসড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন, তারপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা), সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অনুমোদন এবং সবশেষে জাতীয় সংসদে ২০১২ সালে পাস হয় নতুন ভ্যাট আইন।
প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের কথা সে সময়ই জানিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিরোধিতায় তা আর পারেননি তিনি। অর্থমন্ত্রী পরে আরও এক বছর পিছিয়ে এ বছরের জুলাই থেকে আইন কার্যকরের এক রকম অনড় সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা থেকেও পেছানো হয় দুই বছর।
এ বিষয়ে গত ২৮ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে তাঁর বাজেট সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘তাতেও মনে হয় করদাতাদের আমরা সন্তুষ্ট করতে পারিনি।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, কর আরোপ প্রক্রিয়ায় ভ্যাট একটি উত্তম পন্থা। আগের আইনটি অফলপ্রসূ হয়ে পড়ায় ২০০৮ থেকে চার বছর বিতর্ক চলার পর ২০১২ সালে আইন পাস হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কয়েক বছর আগে সাত কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলার বর্ধিত ঋণসহায়তা বা ইসিএফ দেওয়ার শর্ত হিসেবে ভ্যাট খাত সংস্কারের কথা বলেছিল। তারপরই সরকার নতুন ভ্যাট আইন করা ও তা বাস্তবায়নে মনোযোগ দেয় বলে জানা গেছে। অনেকের কাছে প্রশংসিতও হয়েছে এ আইন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে অবশ্য জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর না হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ৫৪ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমানো নিয়ে তাঁদের দাবি ছিল, আইনটিই স্থগিত হয়ে যাবে—এতটা তাঁরা ভাবেননি। ভ্যাট আদায়কারী সংস্থা এনবিআরও এখন বিব্রত বলে জানা গেছে। সংস্থাটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।

জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর আসছে!
এদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুরোপুরি বাস্তবায়নে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল সচিবালয়ে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বহুদিন ধরে এমন অবস্থানে ছিলাম যে বাজেটের সময়কাল জুলাই-জুনই ঠিক আছে। কিন্তু এখন নতুন নতুন ধারণা আসছে। একটা প্রস্তাব এসেছিল এপ্রিল-মার্চ। এখন কেউ কেউ জানুয়ারি-ডিসেম্বরের কথাও বলছেন।’
বিষয়টা নিয়ে দেশে গণবিতর্ক হতে পারে জানিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মুহিত বলেন, ‘আপনারা আরও ভালো ভালো ধারণা দিতে পারেন।’

Leave a Reply

Top