ভান বা ভণ্ডামি নয় – হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > জীবন-যাপন > ভান বা ভণ্ডামি নয় – হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ

ভান বা ভণ্ডামি নয় – হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ

অনলাইন ডেস্ক :

ঘটনা
সেদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মিতু (কাল্পনিক নাম) হঠাত্ করেই বলতে লাগল, তার খুব খারাপ লাগছে। বলতে বলতেই গড়িয়ে পড়ে গেল মাটিতে। সবাই ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিল। তার দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ। নিঃশ্বাস নিতে লাগল খুব জোরে জোরে, যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হাজারো ডাকাডাকি, চোখেমুখে পানির ঝাপটা, তবু সে চোখ খুলল না। শক্ত করে বন্ধ থাকা তার দুই চোখ পিটপিট করছে কেবল। বাবা-মা অস্থির হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন কাছের একটি হাসপাতালে। পরীক্ষা করে চিকিত্সক তাঁদের জানালেন, মিতু সম্ভবত হিস্টিরিয়া রোগে ভুগছে। পরবর্তী চিকিত্সার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হলো তাকে।
আমাদের অবচেতন মনের অবদমিত মানসিক দ্বন্দ্ব থেকেই হিস্টিরিয়া রোগের সৃষ্টি। হিস্টিরিয়াকে বলা হয় ‘কনভারসন ডিজঅর্ডার’ বা ‘কনভারসন ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার’। কনভারসন ডিসঅর্ডারে শারীরিক লক্ষণ—হাত-পা অবশ, কথা বলতে না পারা—প্রভৃতি নিয়ে রোগের প্রকাশভঙ্গি দেখা যায়। যদিও প্রকৃতপক্ষে শারীরিক কোনো সমস্যা থাকে না। আর ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডারে বিভিন্ন মানসিক লক্ষণ দেখা যায়—যেমন, ভুলে যাওয়া, নিজের পরিচয় মনে করতে না পারা, নিরুদ্দেশে চলে যাওয়া, পূর্বের স্মৃতি ভুলে যাওয়া প্রভৃতি।

আমাদের অবচেতন মনের কিছু অবদমিত সহজাত কামনার সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচারের সংঘাত ঘটে। সৃষ্টি হয় সহ্যাতীত উত্কণ্ঠা ও মানসিক চাপ। ফলে আমাদের অজ্ঞাতেই কিছু মানসিক ক্রিয়া সেই সহজাত কামনাগুলোকে দমন করে। যখন কোনো কারণে মানসিক ক্রিয়াশক্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেই অবাঞ্ছিত অবদমিত কামনাগুলো সজ্ঞান চেতনায় উঠে আসতে চায়। শুরু হয় দ্বন্দ্ব, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা শারীরিক লক্ষণে। কারও কারও মতে, সামাজিক বিধিনিষেধ যখন আমাদের কামনা-বাসনাগুলোকে অবদমিত করে রাখে, তখন সেই অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো অন্যভাবে (শারীরিক লক্ষণ হিসেবে) প্রকাশ পায়; তখন হয় হিস্টিরিয়া।
মস্তিষ্কের বাঁ ও ডান—দুটি অংশ থাকে। যখন কোনো কারণে দুই অংশের কাজে সমন্বয়হীনতা ঘটে, তখন হিস্টিরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। মস্তিষ্কের ‘ব্যাসাল গ্যাংলিয়া’ ও ‘থ্যালামাস’—এ দুটি অংশকে হিস্টিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে ধারণা করা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে যদি কাউকে নিপীড়ন করা হয়, কেউ যদি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, কাউকে যদি কোনো কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং এসব ক্ষেত্রে তারা যদি বিষয়টি প্রকাশ করতে না পারে, উপযুক্ত প্রতিকার না পায়, তবে অবদমিত ক্ষোভ ও ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তি থেকে হিস্টিরিয়া দেখা যেতে পারে।

ওপরের মিতুর ঘটনার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে—যেমন সামনে তার এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো নয় কিন্তু তার এই খারাপ প্রস্তুতিটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তার মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র মানসিক চাপ ও উত্কণ্ঠা। আর সেই মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার শারীরিক লক্ষণের মধ্য দিয়ে। আবার এমনটাও হতে পারে যে সে তার এক সহপাঠীকে পছন্দ করে, কিন্তু তার বাবা-মা সেই সম্পর্ক মেনে নিতে পারছেন না। আবার মিতুও তার বাবা-মার মতের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাই তার মনের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো শারীরিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আবার এমনটাও হতে পারে, মিতু তার বাড়িতে বা কলেজে বা কোচিংয়ে কারও দ্বারা ক্রমাগত উত্ত্যক্ত হচ্ছে, কিন্তু লজ্জায় সে কাউকে তা বলতে পারছে না। তখন বলতে না পারা কথাগুলো তার মনে তৈরি করছে মানসিক চাপ ও দ্বন্দ্ব, যার প্রকাশ ঘটছে শারীরিকভাবে।
ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি। বয়ঃসন্ধিকালে এ সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। হিস্টিরিয়ার সঙ্গে বিষণ্নতা, উত্কণ্ঠা, ব্যক্তিত্বের বিকার প্রভৃতি মানসিক রোগ থাকতে পারে। হিস্টিরিয়ায় কখনো শরীরের কোনো অংশ—যেমন হাত-পা বা পুরো শরীরই অবশ হয়ে যাচ্ছে বলে রোগী অভিযোগ করে। কথা বলতে না পারা, ঢোক গিলতে না পারা, গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে বলে মনে হওয়া বা প্রস্রাব আটকে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

আবার কখনো দেখা যায়, রোগী কথা বলতে হঠাত্ করেই কথা বলতে পারছে না, ইশারা-ইঙ্গিতে সব বোঝাচ্ছে। কখনো চোখে না দেখা বা কানে শুনতে না পারার মতো লক্ষণও তাদের থাকে। খিঁচুনির মতো লক্ষণও থাকতে পারে হিস্টিরিয়া রোগীর। বারবার খিঁচুনি হয়ে তারা ‘অজ্ঞান’ হয়ে যায়। যদিও সেটা প্রকৃত খিঁচুনি বা অজ্ঞান নয়। মৃগী রোগের প্রকৃত খিঁচুনির মতো এখানে জিব বা ঠোঁট কেটে যায় না, কাপড়চোপড়ে প্রস্রাব হয়ে যায় না, একা থাকলে বা ঘুমের মধ্যে হিস্টিরিয়া রোগীর খিঁচুনি হয় না।
হাত-পায়ের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, বারবার চোখের পলক পড়া, জোর করে চোখ বন্ধ করে রাখা, ঘাড় বাঁকা করে থাকা এবং বমি করা বা বারবার বমির চেষ্টা করা প্রভৃতি লক্ষণও থাকতে পারে। রোগের লক্ষণগুলো নিয়ে তাদের স্বজনদের মধ্যে যতই উত্কণ্ঠা থাকুক, রোগী নিজে কিন্তু অনেকটা বিকারহীন থাকে।

অনেক সময় দেখা যায়, রোগী ঢেউয়ের মতো হাত নাড়াতে নাড়াতে দেহকে অনিয়মিতভাবে কাঁপিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে হাঁটে। মনে হয়, এই বুঝি পড়ে যাবে। তবে সাধারণত তারা পড়ে যায় না। যদি পড়েও যায়, তবে এমনভাবে পড়ে, যাতে দেহে কোনো আঘাত না লাগে। শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে হিস্টিরিয়া রোগী তার অবদমিত ইচ্ছাগুলোর যে ইঙ্গিতময় প্রকাশ ঘটায়, সেটাকে বলা হয় প্রাথমিক অর্জন। আর শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ করে সে তার পরিবার ও সমাজ থেকে যে করুণা, সহানুভূতি অর্জন করে এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পায়, তা তার পরবর্তী অর্জন।

ভান বা ভণ্ডামি নয়, মানসিক রোগ

একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে হিস্টিরিয়া কোনো রোগ নয়। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক চিকিত্সকও বলে থাকেন, হিস্টিরিয়া এক ধরনের ভান। আসলে হিস্টিরিয়া কোনো ভান নয়, ভণ্ডামি নয়—মনের রোগ। এ রোগের উপযুক্ত চিকিত্সা আছে। আরও ধারণা করা হয় যে রোগী ইচ্ছা করে তার লক্ষণগুলো দেখাচ্ছে কিন্তু বাস্তব ঘটনা হচ্ছে, সে মোটেই ইচ্ছা করে এসব করছে না, বরং তার অবচেতন মন তাকে দিয়ে এ লক্ষণগুলো ফুটিয়ে তুলছে তার প্রকৃত ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে। তাই তাকে এ রোগের জন্য বকা দেওয়া, সমালোচনা বা তিরস্কার করা চলবে না। হিস্টিরিয়া একটি রোগ। একে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। এ রোগের নিরাময়ের জন্য চিকিত্সকের পাশাপাশি রোগীর স্বজনদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।

চিকিত্সা হোক গুরুত্ব দিয়ে

এ রোগের চিকিত্সায় রোগীকে প্রাইমারি গেইন ও হিস্টিরিক গেইন অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তাই তার রোগের লক্ষণকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও অহেতুক বাড়াবাড়ি করা যাবে না—যেমন হিস্টিরিয়ায় পক্ষাঘাতগ্রস্ততার মতো লক্ষণ দেখা গেলেও সঙ্গে সঙ্গে তাকে হুইল-চেয়ারের ব্যবস্থা না করে হাঁটতে উত্সাহিত করতে হবে। তার চারপাশে ভিড় করে স্বজনদের বিলাপ করা, হাত-পায়ে তেল মালিশ করা, মাথায় বালতি-বালতি পানি ঢালা—এসব করা চলবে না। রোগী ও তার স্বজনদের কাছ থেকে তার রোগের ধারাবাহিক ও বিস্তারিত বর্ণনা নেবেন চিকিত্সক।

রোগের লক্ষণগুলো কোনো প্রকৃত শারীরিক কারণে হচ্ছে কি না, তা জানার জন্য অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। রোগীকে ইতিবাচক ভঙ্গিতে আশ্বস্ত করতে হবে যে তার এ রোগটি সাময়িক, নিরাময়যোগ্য—হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রোগ দ্রুত নিরাময়ের জন্য তার সঙ্গে যথাসম্ভব বেশি আলোচনা করতে হবে। তার মনের অন্তর্জগত্ থেকে তার না-বলা কথাগুলো খুঁজে বের করে আনতে হবে এবং অবশ্যই কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। হিস্টিরিয়ার সঙ্গে উত্কণ্ঠা বা বিষণ্নতা থাকলে কেবল চিকিত্সকের পরামর্শে উত্কণ্ঠাবিনাশী ও বিষণ্নতারোধী ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। কাউন্সেলিং, পারিবারিক সাইকোথেরাপি ও গ্রুপ সাইকোথেরাপির মাধ্যমে হিস্টিরিয়ার চিকিত্সা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর অবচেতন মনের দ্বন্দ্ব দূর করা হয়।
হিস্টিরিয়া রোগকে তাচ্ছিল্য ও রোগীকে অবহেলা করে নয়, বরং রোগটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। যেকোনো শারীরিক রোগের মতোই এটি এক ধরনের মানসিক রোগ। আমাদের চারপাশে অনেকেই এ রোগে ভুগছে আর অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছে। কেবল উপযুক্ত চিকিত্সা ও পরিমিত সহানুভূতিই পারে এ রোগ থেকে রোগীকে সারিয়ে তুলতে। এ জন্য প্রয়োজন সবার সচেতনতা ও সহযোগিতা।

আহমেদ হেলাল
হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

One thought on “ভান বা ভণ্ডামি নয় – হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ

Leave a Reply

Top