You are here
Home > খোলা আকাশ > বন্যার কারণ এবং বন্যা পরবর্তী করণীয়

বন্যার কারণ এবং বন্যা পরবর্তী করণীয়

মনির মুন্‌না

বন্যার কারণ: প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই বন্যা হতে পারে। বন্যার প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট কারণ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

বন্যার প্রাকৃতিক কারণ:

ক) দীর্ঘস্থায়ী অতিবর্ষণ: মৌসুমী জলবায়ুর প্রভাবে বর্ষাঋতুতে কোন নদীর উচ্চ-অববাহিকায় দীর্ঘস্থায়ী অতিবর্ষণে ঐ নদীর নিন্ম-অববাহিকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিন্ম অববাহিকায় নদী প্রণালী অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে পারে না। ফলে পাড় ছাপিয়ে উপচে পড়া পানি নিন্ম-অববাহিকার সন্নিকটস্থ সমতল ভূমিকে প্লাবিত করে।

খ) নদীর সর্পিল গতিপথ: নদীর সর্পিল বা তরঙ্গায়িত গতিপথ বন্যার অন্যতম কারণ। সর্পিল গতিপথ যুক্ত নদীতে পানির স্বাভাবিক অপসারণ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে নদী প্রণালীতে পানি দাঁড়িয়ে থাকে। এই অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী অতিবর্ষণে নদী প্রণালীতে পানি ক্রমপুঞ্জিভূত হয় এবং একটি সময়ে অতিরিক্ত পানি নদীর পাড় ছাপিয়ে সর্পিল গতিপথের সন্নিকটস্থ অঞ্চলকে প্লাবিত করে।

গ) নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা: ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে ধস নেমে নদীতে পানির স্বাভাবিক মুক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হলে বন্যা প্ররোচিত হতে পারে। কারণ ধস জনিত বাধা দূরীকরণের ফলে নদীর নি¤œ অববাহিকায় ফ্ল্যাশ-ফ্লাড সৃষ্টি হতে পারে।

ঘ) বিস্তৃত বন্যাপ্রবণ সমতলভূমি: নদীর গতিপথে বিস্তৃত বন্যাপ্রবণ সমতলভূমিতে বন্যার তীব্রতা এবং বিস্তারকে বৃদ্ধি করে।

ঙ) নদী প্রণালীর ঢাল বা নতির পরিবর্তন: পর্বতের পাদদেশীয় ঢাল এবং সমতলের উচ্চপ্রান্তের মধ্যবর্তী নদী প্রণালীর নতির হঠাৎ পরিবর্তন বন্যা প্ররোচিত করে।

চ) সাইক্লোন: যুগপৎ মুষলধারে বৃষ্টি এবং নি¤œচাপ বা ডিপ্রেসানজনিত জলোচ্ছাসে উপকূলবর্তী নিচু অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।

ছ) হিমালয়ের শীর্ষে তুষারের গলন: প্রবল বর্ষণ ব্যতিরেকে হিমালয়ের শীর্ষে সঞ্চিত বরফের বেশিমাত্রায় গলন বন্যার অন্যতম কারণ।

বন্যার মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:

ক) নদী প্রণালীর পরিবর্তন: নদী প্রণালীর কৃত্রিম পরিবর্তন বন্যাকে প্ররোচিত করে। পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানিসেচের কারণে নদী প্রণালীতে বাঁধ এবং রিজার্ভার নির্মিত হলে নদীর নি¤œ অববাহিকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। বর্ষাকালে অতিবর্ষণ এবং বাঁধ বা রিজার্ভার থেকে পানিনির্গমন যদি যুগপৎ ঘটে তাহলে নির্গত প্রবাহের আধিক্যের কারণে নদীর নি¤œ অববাহিকায় বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নদী প্রণালীতে বাঁধ দিয়ে এবং খাল কেটে নদীকে ভিন্নমুখী করলেও ভিন্নমুখ নদী সন্নিকটস্থ সমতলে বন্যা ঘটাতে পারে।

খ) নদীগর্ভে পলিসঞ্চয়: নদীগর্ভে পলিসঞ্চিত হলে বন্যা প্ররোচিত হয়। অতিবর্ষণে তীর পৃষ্ঠীয় প্রবাহের দ্বারা শীর্ষ-মৃত্তিকা ক্ষয়িত হয়ে নদীগর্ভে জমা হয়। নদীগর্ভে সঞ্চিত শীর্ষ মৃত্তিকাকে ‘পলি’ বলা হয়। এইভাবে নদীগর্ভে পলির ক্রমসঞ্চয়ে নদীর নাব্য হ্রাস পায়। ফলে, বর্ষাকালে অতিবর্ষণজনিত নদীপ্রণালী ধরে রাখতে সক্ষম হয় না। এমতাবস্থায় নদীরকূল উপছিয়ে যাওয়া পানি নদীর উভয় পার্শ্বের সমতলকে প্লাবিত করে। এইভাবে নদীগর্ভে পলিসঞ্চয়জনিত কারণে নদীর নাব্য হ্রাস বন্যার তীব্রতা এবং বিস্তারকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে।

মৃত্তিকা ক্ষয়ের মুনষ্যসৃষ্ট কারণগুলি উল্লেখ করা হলো:

যথাযথ নয় এমন কৃষিরীতি:

১. উৎপাদন বৃদ্ধিকারক শস্যের চাষ (অর্থাৎ পর্যায়ক্রমিক শস্য বপন না করা)।

২. ন্যূনতম অঞ্চল ভূমিকর্ষণ এবং ঢালচিহ্ন বরাবর হলকর্ষণরীতি অনুসরণ না করা।

৩. মৃত্তিকা ক্ষয়প্রবণ প্রান্তীয় ভূমিতে (যথা পাহাড়ের খাড়া ঢালে) চাষাবাদ এবং মৃত্তিকা ক্ষয়প্রবণ জমিতে গবাদিপশু প্রতিপালন।

৪. শিল্পাপয়ন, নগরায়ণ।

৫. কৃষ্টিতে জমি সরবরাহ করার জন্য অরণ্যনিধন। তৃণভূমির ভুল পরিচালন।

যথাযথ নয় এমন শিল্পায়ন এবং নগরায়ণ:

রাস্তাঘাটা, পাকাবাড়ী, কংক্রিট ফুটপাথ এবং সিমেন্ট বাঁধানো অঙ্গন বা বাড়ীর উঠান ইত্যাদি বৃষ্টিজনিত সঞ্চিত পৃষ্ঠীয় পানিকে মৃত্তিকায় অনুপ্রবেশে বা চুইয়ে যাওয়াতে বাধা দান করে। এই কারণে পৃষ্ঠীয় প্রবাহ তীব্রতর হয়। এই তীব্র পৃষ্ঠীয় প্রবাহ যখন অনাবৃত মৃত্তিকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন শীর্ষ-মৃত্তিকা ক্ষয়ে যায়।

নদীপার্শ্বস্থ প্রাকৃতিক ভৌত পরিবেশের বিনাশ:

অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষত বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপে নদী পার্শ্বস্থ প্রাকৃতিক ভৌত পরিবেশ ক্রমশঃ ধ্বংস হচ্ছে। নদীর বাঁধ, বন্যা প্রাচীর এবং বন্যাপ্রবণ নিচু অঞ্চলে অবৈধভাবে জনবসতি গড়ে ওঠায় নদী প্রণালী ক্রমসঙ্কুচিত হচ্ছে। এছাড়া পৌরসংস্থার জঞ্জাল এবং নর্দমা নির্গত আবর্জনার প্রভাবে নদীগর্ভ ক্রমশ ভরাট হচ্ছে, ফলে নদী প্রণালীর নাব্য হ্রাস পাচ্ছে। এইসব কারণে নদীপার্শ্বস্থ প্রাকৃতিক ভৌত পরিবেশ ধ্বংস হওয়ায় বর্ষাকালে নদীতে বন্যা প্ররোচিত হচ্ছে।

বন্যা পরবর্তী করণীয়:

বন্যা-পরবর্তী রোগ-বালাই প্রতিরোধে মেডিকেল টিম স্ট্যান্ডবাই রাখা। বন্যার কারণে স্থগিতকৃত ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি শুধু স্থগিত নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের গৃহীত ঋণের এক বছরের কিস্তির সমপরিমাণ টাকা মওকুফ করা। এ ক্ষেত্রে পিকেএসএফসহ ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক-বীমা ও সংস্থাকে সে অর্থ রাইট অফ করা। নতুবা ঋণ প্রদানকারী স্থানীয় এনজিওগুলো বিপদগ্রস্ত হবে। নতুন করে ফসল ও গবাদিপশুর জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াটার ও স্যানিটেশনের জন্য ল্যাট্রিন, বাথরুম, প্ল্যাটফর্মসহ টিউবওয়েল দেওয়া। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামত করা। গৃহনির্মাণে সহযোগিতা দেওয়া। সবজি বীজসহ চরের মাটির উপযোগী ফসল বীজ সরবরাহ করা।

বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে থাকা স্কুল-কলেজের ছাত্রদের শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের বইপত্র বিনষ্ট হয়ে থাকলে তাদের নতুন করে শিক্ষা উপকরণ দেওয়া। এসব কাজ ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়ক।

বিশ্বাস করি, উপরোক্ত বিষয়গুলো সম্পাদিত হলে এসব মানুষ ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবে। তবে নদী সংক্রান্ত নিরন্তর কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে স্থায়ী সমাধান দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ ভরে ওঠার ফলে অল্প পানিতেও নদীতীরবর্তী এলাকা ডুবে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। এ জন্য নদী খনন অগ্রাধিকারভাবে করা জরুরি। নদীতীরকে স্থায়ী অবকাঠামোর আকারে শাসনের মধ্যে নেওয়া। এ ছাড়াও প্রয়োজন নদী কর্তৃপক্ষকে কার্যকর করা। ছোট-বড় নদীর প্রবাহকে নিয়মিতকরণ, অপদখল ও নদীদূষণ দূর করা। জলাশয়গুলোকে মুক্ত করা। নদীকে মেরে ফেলে কষ্টের সমাধান হবে না। নদীর পৃথক সত্তাকে মেনে নিয়েই আমাদের উন্নয়ন পরিকাঠামোসহ সব উন্নয়ন করতে হবে। তবেই কষ্ট লাঘব হবে।

বানভাসি মানুষের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কমিয়ে দুর্যোগ পরবতী ব্যবস্থা হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত মানুষদের পুনরুদ্ধার করে প্রয়োজনীয় ত্রাণ বিতরণ করা, সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠিান মেরামত করা, বিভিন্ন অবকাঠামো পুনরায় নির্মাণ করা, চিকিৎসা স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্থ জনগনের পুনবার্সনের ব্যবস্থা করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে। প্রস্তুতি, সাড়াদান, পুনরুদ্ধার এবং প্রশমন; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব পর্যায়ে সকল অংশীজনদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

মনির মুন্‌না । munna1700@gmail.com

Leave a Reply

Top