You are here
Home > দূরনীতি ও অপরাধ > পুলিশ বলল, দে আগুন দেখি কত বড় বাপের বেটা

পুলিশ বলল, দে আগুন দেখি কত বড় বাপের বেটা

হাসপাতালে বেডে শুয়ে অটোরিকশাচালক বলছেন, আমার সঙ্গে যে আচরণ হয়েছে তা যেন আর কারোর সঙ্গে না হয়।

বিশেষ সংবাদদাতা :

“আমার তো আর কোনো উপায় ছিল না। কতবার পুলিশকে ‘ঘুষ’ দেব। এর আগে একবার পুলিশ গাড়ি আটকিয়ে থানায় নিয়ে ব্যাটারি খুলে আর ফেরত দেয়নি। পরে ধার করে চব্বিশ শ টাকা দিয়ে ব্যাটারি কিনে গাড়ির মালিককে বুঝিয়ে দিতে হয়। ফের যখন পুলিশ আমার গাড়ি আটকায় তখন পুলিশকে বলেছি, স্যার আমার ভুল হলে ক্ষমা করে দেন, আমার ব্যাটারি ফেরত দেন। আমি গরিব মানুষ। ভাড়া না মারলে স্ত্রী-সন্তান না খেয়ে থাকবে। গাড়ির কিস্তি দিতে পারব না। কিন্তু পুলিশ আমার কোনো কথাই শুনল না। উল্টা আমাকে মারধর করে। টাকা চায়। এরপর রাগে ক্ষোভে সামনের বাজার থেকে ৫০ টাকা দিয়ে আধালিটার কেরোসিন তেল আর দুই টাকা দিয়ে একটি ম্যাচ কিনে ট্রাফিক পুলিশের সামনে দাঁড়াই। বলি, ব্যাটারি দেন তা না হলে গায়ে কোরোসিন ঢেলে আগুন দেব। তাতেও পুলিশ আমার কথা শুনল না। আমাকে বলল, ‘দেখি কত বড় বাপের বেটা হয়েছিস। দে আগুন। ’ এবার আর আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। সত্যি সত্যি ম্যাচটি জ্বালিয়ে গায়ে আগুন দিলাম। ”

গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় শুয়ে কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় অটোরিকশাচালক শামীম শিকদারের। তাঁর দুই হাত ও বুকে ব্যান্ডেজ। দুই কান, মুখ, গলার অনেকটা অংশ ঝলসে গেছে।

হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের সেবা করছিলেন মা রিজিয়া বেগম। তিনিও কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলের এই পরিণতি দেখে মা একবার ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাজ মানুষকে রক্ষা করা, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। পুলিশ কী করে বলে—দে আগুন দে? দেখি তোর কত বড় সাহস। ’ তিনি যোগ করেন, ছেলের উপার্জনের টাকায় পুরো পরিবার খেয়েপরে কোনোমতে বেঁচে রয়েছে। অটোরিকশা চালিয়ে বাসা ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও ছয়টি পেটের খাবার জোগাতেন। এরপর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। এখন চিকিৎসার খরচ কে দেবে?

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, ‘ব্যাটারি খুলে নেওয়ার পর অর্থাৎ মানসিক সমস্যার কারণে শামীম নামের ওই অটোরিকশাচালক আত্মহত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন সে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেল, এ কাজে তাকে কেউ ইন্ধন জুগিয়েছে কি না, ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না—এসব বিষয় কমিটি তদন্ত করছে। ’ এসপি বলেন, এরই মধ্যে তাঁর চিকিৎসার খরচ হিসেবে আট হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তাঁর চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতে গিয়ে পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চরম অপমানিত হয়ে ক্ষোভ থেকেই গত শুক্রবার সকালে নিজের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে শামীম শিকদার আত্মহত্যার চেষ্টা চালান অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গতকাল রবিবার দুপুরে বার্ন ইউনিটের সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠতেই চোখে পড়ে অগ্নিদগ্ধ নারী, শিশু, বৃদ্ধ তাদের কেউ যন্ত্রণায় কাতর আবার কেউ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যান্ডেজে মোড়ানো। তাদের দেখতে দেখতে হেঁটে বারান্দার শেষ মাথায় গিয়ে পাওয়া যায় শামীম শিকদারকে। অগ্নিদগ্ধ অটোরিকশাচালক শামীম শিকদার কঠিন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে এক হাতে নিজের ভেজাচোখ, অপর হাতে সন্তানের চোখের জল মুচছেন মা রিজিয়া বেগম। ‘মা চুলকায়, আর যে পারছি না, মলম দাও’। সন্তানের কথামতো পোড়া ক্ষতে মলম লাগিয়ে দিতেই চিৎকার করে ওঠেন শামীম। শামীম বলেন, ‘মা তুমি কী লাগালে, জ্বলতাছে। তোমার হাতে মরিচ না কি? এ নিয়ে মা-ছেলে কান্নাকাটি করেন।

রিজিয়া বেগম বলেন, ‘ভুল তো পুলিশই করেছে, ছেলে যখন গায়ে আগুন দেবে বলেছে, তখন কেন পুলিশ তাকে বাধা দিল না। এখন ছেলের এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। ’ তিনি এর বিচার চান।

অটোরিকশাচালক শামীমের বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ভাইজোড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম শাহজাহান শিকদার। শামীমের বাবা অনেক আগে মারা যান। মা, স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে শামীম থাকেন আশুলিয়ার নরসিংহপুরে। স্ত্রী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়ে তানুজা আক্তার সুমির কানে সমস্যা। অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক টাকা লাগবে। ছোট মেয়ে তানহা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল বলেন, শামীম শিকদারের শরীরের ৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তবে তিনি আশঙ্কামুক্ত। চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠবেন তিনি।

শামীম বলেন, তিন মাস আগে তিনি ভাড়ায় অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। সে সময় একবার পুলিশ তাঁর অটোরিকশার ব্যাটারি খুলে নেয়। এরপর থানায় নিয়ে গাড়ি আটকে রাখে। পরে ওই ব্যাটারি ফেরত দেয়নি পুলিশ। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি পুলিশ ওই ব্যাটারি বিক্রি করে দিয়েছে। গরিব মানুষ। ধার করে গাড়ির মালিককে ২৪ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়। এরপর কিছুদিন বেকার হয়ে পড়েন। পরিবার নিয়ে চলতে খুব সমস্যা হয়। অনেক তদবির করে কিস্তিতে আরেকটি অটোরিকশা ক্রয় করেন। প্রতিদিন কিস্তির আড়াই শ টাকা পরিশোধ করতে হয়। পুলিশ এই অটোরিকশাটির ব্যাটারিও খুলে নেয়। ব্যাটারি খুলে নিয়ে অবৈধভাবে দুই হাজার টাকা দাবি করে।

শামীমের এই অভিযোগ অস্বীকার করে সাভার ট্রাফিক পরিদর্শক আবুল হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শামীমের অটোরিকশা আটক করা হয়।

আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল জানান, রিকশাচালক বা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি। তাই এ ঘটনায় আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো সাধারণ ডায়েরিও কেউ করেনি। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দগ্ধ অটোরিকশার চালক শামীম শিকদারের শরীরে আগুন দিতে নির্দেশ ও আত্মহত্যার চেষ্টায় প্রণোদনাকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবিতে গতকাল আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়ে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশুলিয়া থানার রিকশা ও ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

Leave a Reply

Top