পাঁচ জেলায় বন্যার অবনতি, পানিতে ডুবে আরো ৯ জনের মৃত্যু – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > প্রচ্ছদ > পাঁচ জেলায় বন্যার অবনতি, পানিতে ডুবে আরো ৯ জনের মৃত্যু

পাঁচ জেলায় বন্যার অবনতি, পানিতে ডুবে আরো ৯ জনের মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টারঃ সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, নওগাঁ, নাটোরসহ কয়েকটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে দিনাজপুর, লালমনিরহাট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে জামালপুরে সাতজন ও গাইবান্ধায় দু’জন মারা গেছে। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে পানিবন্দী লাখ লাখ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

বন্যায় গতকাল বুধবার পর্যন্ত সারা দেশে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯২ জন মারা গেছে পানিতে ডুবে। গত ৪৮ ঘণ্টায় মারা গেছে ২৪ জন। দিনাজপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ২৩ জন মারা গেছেন। বন্যায় এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩৩ লাখ মানুষ।

জামালপুর সংবাদদাতা জানান, জামালপুরে গতকাল বুধবার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় প্রায় ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ৮৭৩ শিাপ্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে শিাকার্যক্রম। এ ছাড়া বন্যায় তলিয়ে গেছে প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। এ দিকে জেলার মেলান্দহে বন্যার পানিতে ডুবে কৃষক আজিবর মোল্লা (৩২), লাল মিয়া (৪০), শিার্থী জিল্লুর রহমান (১৪), সজিব মিয়া (১৪), কমল শেখ (২১) এবং বকশীগঞ্জ উপজেলায় শিার্থী মোজাম্মেল হক (১৬) ও ইলিয়াছ গাজী (১৬) মারা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের আটাবাড়ি গ্রামের কৃষক আজিবর মোল্লা নিজ বাড়ির পাশে ভেলায় চড়ে রাস্তায় উঠতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে গুরুতর আহত হয়ে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যান। এ ছাড়া মেলান্দহ পৌরসভায় নলবাড়িয়া গ্রামের ময়না মিয়ার ছেলে সজীব মিয়া ও নাগেরপাড়া গ্রামের জিল্লুর রহমান নামে দুই বন্ধু বুধবার সকালে বন্যার পানি দেখতে গিয়ে প্রবল স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হয়। এ সময় তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে লাল মিয়া নামে এক ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান। পরে সজীব মিয়া ও জিল্লুর রহমানের লাশ পাওয়া যায়। মৃত সজীব মিয়া ও জিল্লুর রহমান মেলান্দহ উমির উদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিার্থী। একই উপজেলার আলেয়া আজম কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিার্থী কমল শেখ বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। সে জেলার মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া গ্রামের পাগু শেখের ছেলে। কমল শেখ কয়েকজন বন্ধুর সাথে মঙ্গলবার দুপুরে কুলিয়া ঈদগাহ মাঠের পাশে বন্যার পানিতে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল। মঙ্গলবার রাতে তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, বকশীগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে বকশীগঞ্জে পাঁচ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৩০ হেক্টর আমন বীজতলা, ১২০ হেক্টর সবজিতে তলিয়ে গেছে। শিাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি উঠায় ৪৮টি সরকারি প্রাথমিক এবং ১৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার পাঠদান বন্ধ রয়েছে। উপজেলার বগারচর ও মেরুরচর ইউনিয়নে বন্যার পানির তোড়ে দু’টি ব্রিজ ভেঙে গেছে। বন্যায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সাধুরপাড় ও মেরুরচর ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের সাথে উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বকশীগঞ্জ পৌর এলাকার ধুমালী পশ্চিমপাড়া গ্রামের আবেদ আলীর প্রতিবন্ধী ছেলে মোজাম্মেল হক বুধবার সকালে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। এ ছাড়া দুই দিন আগে নিখোঁজ হওয়া ইলিয়াছ গাজীর লাশ বুধবার সকালে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি ও শাহজাদপুরের গোপালপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পানির প্রবল তোড়ে ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলার ৩৩টি ইউনিয়নের ২৯০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপর দিকে জেলার শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের পাঁচিল-গোপালপুর সড়ক মঙ্গলবার রাত ৩টায় ভেঙে গেছে।

বুধবার ভোর রাতে গোপালপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার ভেঙে যমুনার পানির প্রবল স্রোত হুরাসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী, জালালপুর, বেলতৈল ইউনিয়নের হাজারো একর আমন ধান, ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। এ দিকে বাঁধটি শাহজাদপুর উপজেলা সদরের সাথে এনায়েতপুরের দু’টি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা হওয়ায় যাত্রাপথে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার কাজিপুর, সদর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে বন্যাকবলিত এলাকায় তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ, ৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ, আট হাজার ২৩৪টি ঘরবাড়ি অংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার ৪৯৪ হেক্টর ফসল ও ৩০ কিলোমিটার রাস্তা-বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, তাড়াশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের প্রায় দুই হাজার হেক্টর আবাদি রোপা আমন ধানের জমি তলিয়ে গেছে। তা ছাড়া নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে

ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি সামান্য হ্রাস পেলেও ইসলামপুরে বন্যার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদনদীর অববাহিকার এ উপজেলায় উপজেলা পরিষদ চত্বরসহ ১২ ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ-রৌমারী-রাজিবপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের একাধিক স্থানে ভেঙে যাওয়ায় ঢাকা ও জামালপুরের সাথে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে যমুনা নদীর পানি। যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির প্রবল চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ১০টি স্থানে হুমকির মুখে পড়েছে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আর আতঙ্ক বাড়ছে। বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় মানুষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। সেই সাথে বেড়েছে মানুষের কষ্ট।

সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা জানান, সারিয়াকান্দির কাছে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দুই হাজার ২২৫ হেক্টরের আউশ, রোপা আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আটটি কমিউনিটি কিনিক প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়াও ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের নিজবলাইল, হাসনাপাড়া সদর ইউনিয়নের দীঘলকান্দি পুরনো বাঁধ, কুতুবপুর, কামালপুর ইউনিয়নের বিবিরপাড়া, হাওরাখালী, গোদাখালী বাঁধে ব্যাপক ফাটল দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৯টি ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কার্যালয় থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণের কথা বলা হলেও দ্বিতীয় দফা বন্যায় এখন পর্যন্ত বানভাসী মানুষের কাছে কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি।
বন্যাকবলিত তিন উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ৯১টি গ্রামে পানি ওঠায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধা জেলার সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যানুযায়ী সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন এবং গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ দিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পানিতে ডুবে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের তালুককানুপুর গ্রামের রিয়ামনি নামে আড়াই বছরের এক শিশু ও গোবিন্দগঞ্জে হানিফ নামের এক শিশু মারা গেছে।

গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের ডেভিড কোম্পানীপাড়া, বাহারবন, চকমামরোজপুর, কাজলঢোপের আটটি পয়েন্ট একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত আকস্মিকভাবে ডেভিড কোম্পানীপাড়ার চারটি পয়েন্টে বাঁধের ছিদ্র পথে পানি চোঁয়াতে শুরু করে। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল ও পৌরমেয়র অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলনসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ তৎপরতার সাথে বালুর বস্তা দিয়ে ও রিং তৈরি করে পানি চোঁয়ানো বন্ধ করে বাঁধটিকে ধ্বংসের হাত রক্ষা করতে সম হন।

এ ছাড়া বহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়া-রতনপুর ও কাতলামারী দু’টি পয়েন্টে বহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর বন্যার পানির তোড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে গেলে জেলা শহরসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। এ কারণে বাঁধসংলগ্ন এলাকাগুলোর লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চেরেঙ্গা এলাকায় করতোয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১০০ মিটার অংশ মঙ্গলবার ভেঙে যাওয়ায় আটটি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ঘাঘটের পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং করতোয়ার নদীর পানি বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া তিস্তা নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, পলাশবাড়ীর নি¤œাঞ্চল হোসেনপুর ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতোয়া নদীর কিশমত চেরেঙ্গা বাঁধ ভাঙনের ফলে ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ৫ শ’ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ দিকে কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতোয়া নদীর টোংরারদহ নামক স্থানে বাঁধ ভাঙার উপক্রম। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে।

গত সোমবার রাতে থেকেই চেরেঙ্গা বাঁধটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে টের পেয়ে তাড়িঘড়ি করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জনবল ওই রাত থেকেই বাঁধের ওপর বালুর বস্তা আস্তরসহ পানিতে নিক্ষেপ করেও শেষ পর্যন্ত আর শেষ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বাঁধটি আকস্মিক ধসে যায়।

সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, সাঘাটা উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বন্যার পানি বাড়ার সাথে সাথে প্রতিদিন নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বন্যায় তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ফসল।

সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুর রহমান জানান, বন্যার পানি বৃদ্ধি এবং বন্যার্তরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেয়ায় এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকার ৪৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চিলমারীতে হুমকির মুখে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের পাউবো বাঁধ। যেকোনো মুহূর্তে এই বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা।
নওগাঁ সংবাদদাতা জানান, জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে আটটি উপজেলার মানুষ এখন বন্যাকবলিত। রানীনগর মান্দা ও আত্রাই উপজেলার ১৫টি স্থানে আত্রাই ও ছোট যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলা সদরের সাথে আত্রাই উপজেলার ও নাটোর জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে নওগাঁর ৯টি উপজেলার এক লাখ হেক্টর বিঘার ফসলিজমি তলিয়ে গেছে এবং কয়েক হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। তিন লক্ষাধিক লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার পতœীতলা নতুন করে আত্রাই নদীর বাঁধ ভেঙে ও বুধবার সাপাহারে পুনর্ভবা নদীর বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার লোক পানিবন্দী হয়েছে। বন্যায় হাজার হাজার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এ ছাড়া জেলার ধামইরহাট গতরাতে ধামইরহাট সীমান্তের সেলিমপুরে আত্রাই নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, সরিষাবাড়ীতে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলার সদর পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়ন এবং রেলওয়ে ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যমুনায় বুধবার বিকেল পর্যন্ত ১৩৪ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার ২২৪টি গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বুধবার সকালে সদরের পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, খাদ্য গুদাম, টিএনটি অফিস, আলহাজ জুট মিলস, এ আর এ জুট মিলস, পপুলার জুট মিলস ও মিমকো জুট মিলসে বন্যার পানি ঢুকেছে। গতরাত ৩টা থেকে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। সর্বত্র থই থই পানি আর পানি।

বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, বেড়ার নগরবাড়ী মথুরা পয়েন্টে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় তাঁতশিল্প চরম লোকসানের মুখে পড়েছে।

সরেজমিন এসব এলাকা ঘুরে, স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে এ দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে। বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নগরবাড়ীর মথুরা পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৩০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মান্দা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, মান্দায় বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বরাদ্দকৃত পাঁচ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। একই দিন বিকেলে কুশুম্বা ইউনিয়নে এক মেট্রিক টন, নুরুল্যাবাদ ইউনিয়নে এক মেট্রিক টন, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে দুই মেট্রিক টন এবং প্রসাদপুর ইউনিয়নে ৫০০ কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুজ্জামান জানান। মাত্র ৫০০ পরিবার ত্রাণ পেলেও বানভাসি আরো লক্ষাধিক পরিবার ত্রাণ না পাওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকে না খেয়ে থাকলেও তাদের দেখার কেউ নেই।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, এনায়েতপুর থানার সীমান্তবর্তী পাচিল-গোপালপুর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ সড়ক প্রবল পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। বুধবার ভোরে বাঁধটির প্রায় ১০০ মিটার ভেঙে যমুনার পানি হুরাসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে অন্তত ১৮টি গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, সাড়ে পাঁচ হাজার একর আবাদি জমি, ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩২টি তাঁত কারখানা ও কয়েক হাজার একর আমন ধান ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া এনায়েতপুর দক্ষিণের সাথে শাহজাদপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

মান্দা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, মান্দার কয়েকটি ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তীব্র খাদ্য ও পানীয় সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে মঙ্গলবার মাত্র পাঁচ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
প্রতি পরিবারে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয় বলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুজ্জামান জানান। উপজেলার বানভাসি আরো লক্ষাধিক পরিবার ত্রাণ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেক ইউনিয়নে এ পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি।

পার্বতীপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, পার্বতীপুরে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা দেড়টার সময় আতাবুর (৫০) বাড়ির পাশে তিলাই নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরতে নদীতে পড়ে যান। এলাকাবাসী তাকে নদী থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় ল্যাম্ব হাসপাতালে ভর্তি করলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি পৌর এলাকার নামাপাড়া মহল্লায়।

নাটোর সংবাদদাতা জানান, নাটোরের সিংড়ার আত্রাই নদী পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় নদী তীরবর্তী জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তীরবর্তী এলাকার প্রায় তিন শতাধিক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত নি¤œাঞ্চল মহেশচন্দ্রপুর ও কতুবাড়ী স্কুলের শিক্ষার্থীরা পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সিংড়া পৌর এলাকাসহ শেরকোল, ডাহিয়া, কলম, তাজপুর ইউনিয়ন এলাকার অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করবে।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নাজমুল আহসান জানান, বর্তমানে আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ৩৯ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আত্রাই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ২৬টি সুতিজাল পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্ত করছে। সেগুলো অপসারণের জন্য সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সাপাহার (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার পাতাড়ী ইউনিয়নের পুনর্ভবা নদীর সাতটি বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে ওই ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি। হাজার হাজার বিঘা জমির ধান, সবজি তে, পুকুর, পান বরজ, আমের বাগান তলিয়ে গেছে।
জানা গেছে, পাতাড়ী ইউনিয়নের জালশুকা, তিলনী, আদাতলা, পাতাড়ী, হাড়িপাল, কাউয়াভাষা, করমুডাঙ্গা, মির্জাপুর, তিলন ভাবুকসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবার তীব্র সঙ্কটসহ চর এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এসব এলাকার দুর্গত মানুষ গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

পাতাড়ী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মুকুল মিঞা জানান, জরুরিভাবে বন্যায় আটকেপড়া পরিবারগুলোকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার এ এফ এম গোলাম ফারুক হোসেন জানান, বন্যায় পাতাড়ী ইউনিয়নে ৪৮০ হেক্টর আউশ, ২৫০০ হেক্টর রোপা আমন এবং ১০৬ হেক্টর শাকসবজিসহ সর্বমোট ৩৮৬ হেক্টর ফসল ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফাহাদ পারভেজ বসুনীয়া জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে চিকিৎসা, শুকনো চিঁড়া, চিনি, চালসহ বিভিন্ন খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

পতœীতলা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণে আত্রাই নদীর পশ্চিম পাশে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পতœীতলা উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মিরাপুর বৈরাগীপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, গোপীনগর, পানবোরাম, চকবল্লভ, বিষ্টপুর, কনচিপুকুরসহ অর্ধশত গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে স্কুল, মাদরাসা, রাস্তা ও বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। পতœীতলা-সাপহার রাস্তা, নজিপুর-রাঙ্গামাটি রাস্তাসহ নজিপুর-ধামইর হাট রাস্তা বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক পথে যোগাযোগ সাময়িক বন্ধ হয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার ভোর রাতে আত্রাই নদীর পূর্ব পাশে পাটিচরা ইউনিয়নের কাশিপুর স্লুইচগেটের অদূরেই নজিপুর-রাঙ্গামাটি বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ বন্যার পানির চাপে শতাধিক হাত ধসে গিয়ে ৩০টি গ্রাম বন্যার কবলে পড়েছে।

পানিবন্দী মানুষেরা জানান, বর্তমান বন্যাকবলিত এলাকায় শিশু-বৃদ্ধসহ অনেকের জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়াসহ নানা রোগ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে ও শত শত পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পানিবন্দী মানুষেরা জানান, এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী আমরা পাইনি। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে খাবার স্যালাইন বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

ধামইরহাট (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর ধামইরহাটে আত্রাই নদীর পাঁচটি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর ও ক্ষেতের ফসল। এখনো উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়নি।
বর্তমানে বৃষ্টিপাত না হলেও ভারত থেকে নেমে আসা পানির ঢলে উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। বাড়িঘর, আমন ধানক্ষেত, কলাবাগান, সবজিক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। অসংখ্য পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বর্তমানে আত্রাই নদীর শিমুলতলী পয়েন্টে বিপদসীমার ২ দশমিক ২৩ মিটার ওপরে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ দিকে ছোট যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসবপুর ইউনিয়নের ২৯টি মৌজার কমবেশি সব এলাকার আমন ধান ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: ইসরাফিল হোসেন বলেন, এখনো পর্যন্ত ২০ গ্রামের দুই হাজার ৭৮৫টি পরিবারের ১৫ হাজার ৫০০ জন মানুষ, তাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব উপদ্রুত এলাকায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষি ড. মো: জামাল উদ্দিন বলেন, আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌর সভায় প্রায় পাঁচ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

নবাবগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, ঢাকার দোহারের নয়াবাড়ি ইউনিয়নের ধোয়াইরের দেওয়ান বাড়ির মোড় এলাকায় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ-মানিকগঞ্জ রক্ষা বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দোহার নবাবগঞ্জের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়ছে পাঁচ শতাধিক পরিবার। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে রয়েছেন দোহার নবাবগঞ্জের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। আতঙ্কে রাত জেগে পাহাড়া দিচ্ছেন এলাকাবাসী।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের ভাগ্যকুল গেইজ স্টেশনের সতর্কবার্তায় জানা গেছে, গত ৩৬ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া দোহার, নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ শহর রক্ষাবাঁধ বা কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধের নবাবগঞ্জের জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বালেঙ্গা এলাকায় বাঁধ চুইয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, ফুলছড়ি উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় গো-খাদ্যের চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ত্রাণসামগ্রী না পৌঁছানোর অভিযোগ তুলেছেন আশ্রিতরা। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ফুলছড়ি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৩ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গত কয়েক দিনের বর্ষণ ও বন্যায় ৯টি ইউনিয়নের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়। এতে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বুধবার থেকে তিস্তা নদীর পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধপত্র প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন বানভাসি মানুষ।

লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি কমে যাওয়ায় বুধবার বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। ফলে জেলার পাঁচ উপজেলার বেশ কিছু এলাকা থেকে ইতোমধ্যে পানি নেমে গেছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া বানভাসি মানুষজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। তবে তিস্তা-ধরলা নদী সংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি থেকে পানি ধীরগতিতে নামায় দুর্ভোগে রয়েছেন বানভাসিরা। এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ এখনো খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কটে ভুগছেন। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ভাবে যে পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের চেয়ে খুবই কম। আবার অনেক বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ এখনো পৌঁছায়নি বলে ভুক্তভোগীরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। বেসরকারিভাবে বিএনপি, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুকনো চিঁড়া ও পানি বিতরণ করলে তার লক্ষ্য নির্বাচনী প্রচারণা মাত্র।

এ দিকে, বন্যার্ত পরিবার পুনর্বাসনে এবং দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠতে বুধবার থেকে লালমনিরহাটের বিজিবিসহ সেনাবাহিনীর তিনটি টিম মাঠে কাজ করছে। লালমনিরহাটের বন্যাদুর্গত এলাকায় রংপুর সেনানিবাসের সদস্যরা বর্তমানে লালমনিরহাটের বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের চিকিৎসাসেবা ও ওষুধপত্র দিচ্ছেন। তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিস্তা নদীর পানি এখন প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে।

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন রাজিবপুরে ৮২টি ও রৌমারীতে ১৯৮টি গ্রামের ২ লাখ মানুষ। কিন্তু কয়দিনের টানা বর্ষণে রৌমারীর ধনারচর বেড়িবাঁধ ও রাজিবপুরে মিয়াপাড়া স্লুইস গেট বেড়িবাঁধ ভেঙে দু’টি উপজেলার ২৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার মাছের পুকুর, রোপা আমন, বীজতলা, কাঁচা-পাকা গ্রামীণ সড়ক। পানি বেড়েই চলছে। মধ্যবিত্ত মানুষ পাচ্ছে না সরকারি কোনো সহায়তা। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভার:) মো: ফাউজুল কবির জানান, এ পর্যন্ত রৌমারীতে বন্যার্তদের মধ্যে ৬০ মেট্রিক টন ও রাজিবপুরে ৩৭ মেট্রিক টন চাল দেয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি ধীর গতিতে হ্রাস পাচ্ছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী জেলার ৯ উপজেলায় ৬০ ইউনিয়নের ৮২০টি গ্রামের ৪ লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বানভাসী মানুষেরা ৫ দিন ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিয়েছে পাকা সড়ক, উচু বাঁধ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্যা দুর্গত এলাকাঁয় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট দেখা দেয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে বানভাসীদের।
গত চার দিনে বন্যার পানিতে ডুবে ১১ জন ও সাপের দংশনে ১ জনসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগই শিশু।

কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে ৪টি পয়েন্টে ধসে যাওয়ার এখনো বন্ধ রয়েছে সোনাহাট স্থলবন্দরসহ নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা। ৪৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে থাকায় বন্ধ রয়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। তলিয়ে গেছে ৫০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন সবজি ক্ষেত। জেলা মৎস্য সম্পদ কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, বন্যার পানিতে ভেসে গেছে জেলার ৮ হাজার পুকুরের প্রায় ১২ কোটি টাকার মাছ।

রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত তা বিপদসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধির কারণে গোয়ালন্দ উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৮৮টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।

গতকাল গোয়ালন্দ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়, পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৬০টি, উজানচর ইউনিয়নের ১৫টি, দেবগ্রামের ৮টি ও ছোট ভাকলা ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ পরিবারের ৫০ হাজার ৬০০ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন পার করছে। ৭টি শিাপ্রতিষ্ঠান বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলার প্রায় ৬৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এসব ইউনিয়নের বন্যাকবলিতদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৫৮.৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণে নোয়াখালীর ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এতে জেলা সদর, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, সোনাইমুড়ী হাতিয়া ও চাটখিল উপজেলার গ্রামের প্রায় শত ভাগ রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৯০ ভাগ বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। জেলার প্রধান বাণিজ্য শহর চৌমুহনী পৌরসভার করিমপুর, হাজীপুর, গনিপুর কিসমত করিমপুর গ্রামের বেশির ভাগ রাস্তা ও বাসাবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত হয়।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে ভূঞাপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ায় বঙ্গবন্ধু সেতু-ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে বঙ্গবন্ধু সেতু-ভূঞাপুর-তারাকান্দি বাঁধে কুঠিবয়ড়া বাজার, গোলপেচা ও সোনামুই এলাকায় ফাটল দেখা দিয়েছে।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এতেও আশঙ্কা মুক্ত না হওয়ায় এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তারাকান্দি থেকে উত্তরবঙ্গ ও দণিাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও বাঁধের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বাঁধটি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। এতে জেলার আরো তিনটি উপজেলা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত যমুনার ভূঞাপুর অংশে বিপদসীমার ১৩৫ সেমি ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল।

চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, চরভদ্রাসন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২টায় উপজেলা পদ্মা নদীতে বন্যার পানি বিপদসীমার প্রায় ৭৯ সেমি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসতঘর পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে এবং পদ্মা নদীর আশপাশ এলাকার শত শত একর আমনক্ষেত তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া রাস্তাঘাট ও কালভার্টের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছেন।

মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ধান সমৃদ্ধ অঞ্চল মোহনগঞ্জের অধিকাংশ রোপা আমন বীজতলাসহ ডুবে গেছে কয়েক শ’ একর রোপণকৃত জমি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উঁচু জমির বীজতলাও পানি উঠে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বুধবার সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সুয়াইর ইউনিয়নের সেখুপুর, পালগাঁও, ভরাম, নলজুরী, পাবই, সুয়াইর, হাটনাইয়া, মাঘান সিয়াধারের মানশ্রী, কুড়েরপাড়, বড়তলী বানিয়াহারীর বড়তলী এলাকাগুলোয় বেশি ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় উপজেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডুবে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক বন্ধ রয়েছে।

Leave a Reply

Top