You are here
Home > অর্থনীতি > পদে পদে জুয়ার ফাঁদ, নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে

পদে পদে জুয়ার ফাঁদ, নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে

বিশেষ প্রতিনিধি :

রাজশাহী নগরীর অন্তত ১০টি পয়েন্টে জুয়ার আসরে প্রতিদিন কমপক্ষে কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। পেশাদার জুয়াড়িদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। জুয়ায় বিপুল অর্থ খুইয়ে গত বছরের শেষ দিকে এক ঠিকাদার আত্মহত্যা করেন। এদিকে জুয়ার আসর বসিয়ে মাঝখান থেকে রাতারাতি লাখপতি বনে যাচ্ছে অনেকে। এদের অনেকেই বাড়ি-গাড়িরও মালিক এখন। অথচ দু-এক বছর আগেও এদের সহায়-সম্বল কিছুই ছিল না। কেউ বস্তিতে থেকে শুধু জুয়ার আসর বসিয়ে লাখপতি বনে গেছে এমন ঘটনাও ঘটেছে। তাসের মাধ্যমে চলে এই জুয়া।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, নগরীর রাজপাড়া থানার গোবিন্দপুর এলাকার ওয়াপদা মাঠ, বন্ধগেট এলাকা, কোর্টবাজারের কাঁচাবাজার, বুলনপুরে রেজাউলের বাড়ি, আলীর মোড়, রায়াপাড়া ঘুঘুপাড়া, চারখুটার মোড়, ডাসমারি এবং বোয়ালিয়া থানার রাজশাহী-শিরোইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রমরমা জুয়ার আসর বসছে প্রতিদিন। ঠিকাদার থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার নিয়ে গিয়েও এসব জুয়ার আসরে যোগ দিচ্ছে। তবে জুয়ার আসর থেকে গাড়িগুলো রাখা হয় একটু নিরাপদ দূরত্বে।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে নগরীর গোবিন্দপুর ওয়াপদা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ৩০-৪০ জন গোল হয়ে বসে আছে। মাঝখানে একজন তাস হাতে নিয়ে একের পর এক ‘কল’ করছে। প্রায় ২০-২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে দেখা যায়, কেউ কেউ বাজিতে হেরে উঠে চলে যাচ্ছে, আবার কেউ হালকা বৃষ্টি উপক্ষো করেই এসে যোগ দিচ্ছে। অবশ্য বৃষ্টি আটকানোর জন্য ত্রিপল টাঙানো আছে ওপরে।

খেলা শেষে চলে যাওয়ার সময় আলফোর রহমান নামের এক ব্যক্তির মুখোমুখি হলে তিনি জানান, একসময় তাঁর চারটি অটোরিকশা ছিল। পৈতৃক সূত্রে বেশ কিছু জমিও ছিল। সব জুয়ায় নিয়েছে। এখন বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রায় দেড় বছর ধরে জুয়ার নেশায় তিনি বুঁদ হয়ে আছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পরিবার এখনো ভালো করে জানে না। সেলিম হোসেন নামের আরেকজন জানান, কোনো দিন সব টাকা হেরে তিনি বাড়িতে যান। কখনো জেতেনও। তবে বেশির ভাগ দিনই হারেন। কিন্তু নেশার টানে আরো অনেকের মতো তিনিও ছুটে আসেন। বাবু নামের একজন জানান, জুয়ার আসরে পুলিশ হানা না দিলেও খেলা শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে কেউ কেউ আটক হয়। এরপর চলে ‘আটক বাণিজ্য’।

জুয়াড়িদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় থানার কোনো কোনো পুলিশ সদস্যকে ম্যানেজ করেই বস্তির গলি, খুপরি ঘর, কোথাও বা প্রকাশ্য মাঠে বসে জুয়ার আসর। এসব আসরে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ব্যক্তি যোগ দিচ্ছে। জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকেই কোনো আসর শুরু হচ্ছে। কোনো আসর বসছে সন্ধ্যার পরপর, যা চলে ভোর পর্যন্ত। দিনের আসরগুলোতে নগরীর বাইরের লোকজনও যোগ দিয়ে থাকে।

জুয়াড়িদের দেওয়া তথ্য মতে, বন্ধগেট এলাকায় জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করেন এলাকার নওশাদ নামের এক ব্যক্তি। আসরে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ লাখ টাকার লেনদেন হয়। কোর্টবাজারের কাঁচাবাজারে আসর নিয়ন্ত্রণে আছেন ভিলেন বাবু নামের এক ব্যক্তি। এখানে সবচেয়ে বড় লেনদেন হয়। এই আসরে প্রতিদিন অন্তত ২৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। গোবিন্দপুর ওয়াপদা মাঠের আসর নিয়ন্ত্রণে আছেন মোস্তাকিন নামের এক ব্যক্তি। এখানে প্রতিদিন অন্তত সাত লাখ টাকার লেনদেন হয়।

রাজশাহী নগরীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুয়ার আসর বসে শিরোইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। এখানে জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করেন মোমিন নামের এক ব্যক্তি। মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের একজন বিতর্কিত নেতাও এই আসরের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এখানে প্রতিদিন অন্তত ২০ লাখ টাকার জুয়ার লেনদেন হয়।

এ ছাড়া ডিঙাডোবার মোড়ে দুই লাখ টাকা, বুলনপুরে রেজাউলের বাড়িতে তাঁর ভাগ্নে মুনসুরের নিয়ন্ত্রণে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা, আলীর মোড়ে রুবেলের নিয়ন্ত্রণে তিন-চার লাখ টাকা, ঘুঘুপাড়া উজ্জ্বলের বাড়িতে দু-তিন লাখ টাকা, চারখুটার মোড়ে হযরত আলীর নিয়ন্ত্রণে এক-দুই লাখ টাকা এবং ডাসমারির রোশনীর বাড়িতে প্রতিদিন ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে।

এর বাইরে টিভিতে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার মাধ্যমে জুয়ার আসর বসান ডাসমারির সোহেল ও শাহ আলমগীর। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে দুটি আসরে প্রতিদিন অন্তত ২০ লাখ টাকার লেনদেন হয়।

একটি জুয়ার বোর্ড নিয়ন্ত্রণকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় থানায় প্রতি সপ্তাহে তাঁকে জুয়া চালানোর জন্য দিতে হয় তিন হাজার টাকা। এর বাইরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে দিতে হয় দুই হাজার টাকা। তাই তিনি নির্বিঘ্নে জুয়ার আসর চালাতেও পারছেন।

ওই জুয়ার নিয়ন্ত্রক আরো জানান, বর্তমান ওয়ার্ড কমিশনার আসার পর এখন আর প্রকাশ্যে জুয়ার আসর তেমন বসে না। গোবিন্দপুর ওয়াপদা মাঠ এবং শিরোইল বাসস্ট্যান্ড ছাড়া আর কোথাও প্রকাশ্যে জুয়ার আসর বসানো যায় না। এসব ক্ষেত্রে বস্তির ভেতরের খুপরি বা সরু গলিতে আসর বসানো হয়। বাইরে বিভিন্ন পয়েন্ট পাহারা দিতে লোক বসানো থাকে। বিপদের আভাস মিললেই জুয়া খেলোয়াড়দের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। ফলে কখনো কখনো অন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি অভিযানে যানও, কাউকে ধরতে পারেন না।

গোবিন্দপুর ওয়াপদা মাঠে জুয়ার আসর বসান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর সোর্স পরিচয়ধারী এক ব্যক্তি। তাঁর দাপটের কারণে প্রকাশ্যেই এখানে প্রতিদিন বসে জুয়ার আসর।

জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘আমাদের থানাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে যে কোনো ধরনের জুয়ার আসর বসানো যাবে না। মাঝেমধ্যে আমরা রেইডও দিচ্ছি। বোয়ালিয়ার শিরোইল এলাকায় আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই। এর পরও কিছু ঘটনা ঘটছেই। এসব নিয়ে প্রয়োজনে আমরা বড় ধরনের অভিযানে যাব।

Leave a Reply

Top