নয়া ইতিহাস বাংলাদেশের – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > খেলাধুলা > নয়া ইতিহাস বাংলাদেশের

নয়া ইতিহাস বাংলাদেশের

উদ্বাহু হয়ে তাইজুলের ওই গগনবিদারী চিৎকারে তখন কাঁপছে মিরপুর, জায়ান্টস্ক্রিনে আনন্দিত প্রধানমন্ত্রীর পতাকা হাতে জয়োৎসবের দৃশ্য, পেশাদারিত্বের নিরপেক্ষতাকে তুড়ি মেরে মিরপুরের প্রেসবক্সে বয়ে যাচ্ছে আবেগের স্রোত! তার মধ্যেও যেন বারবার কানে বাজছিল কথাটি, ‘আমরা খেলতে নামলেই তো এখন ইতিহাস হয়ে যায়…।’ সেদিন মজা করেই বলেছিলেন মুশফিক। কিন্তু তার মধ্যেও যে যত্নে লালিত ছিল বিশ্বাসের প্রবল শক্তিটা, তা তখন আন্দাজ করা যায়নি। গতকাল টেস্ট ক্রিকেটের পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে যখন সাড়ে তিন দিনের মধ্যে হারিয়ে দিল বাংলাদেশ, স্মিথদের অহংগুলো মাটিতে মিশে গেল ২০ রানের হারে- তখন কেউ বলছেন ‘অবিস্মরণীয়’, কেউ বা ‘টাইগারদের ঈদ উপহার’। আর সবাই একসঙ্গে বলছেন ঐতিহাসিক। যে জয়ের সঙ্গে মিশে আছে অনেক না-বলা বিদ্রোহ, নীরব উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্যের যন্ত্রণা। এই অস্ট্রেলিয়াতেই ২০০৩ সালে খেলতে গিয়ে খালেদ মাহমুদ সুজনকে সংবাদ সম্মেলনে শুনতে হয়েছিল, দু’দিনের মধ্যে ম্যাচটি শেষ করতে পারবেন তো? ২০০৫ সালে কার্ডিফে ওয়ানডে জয়ের পর শুনতে হয়েছিল ‘আপসেট’। নিরাপত্তা নিয়েও ছুঁৎমার্গ ছিল যাদের, সেই অসিদের কণ্ঠেই অবশেষে সমার্পণের আর্তি। ‘অল ক্রেডিটস টু বাংলাদেশ…’ স্মিথের এই স্বীকারোক্তির পরেই যেন একটি মুহূর্ত জায়গা করে নিল বিশ্বক্রিকেটের অন্তত ইতিহাসে।
যে ইতিহাসের অন্যতম নায়ক হয়ে থাকবেন সাকিব আল হাসান। একটা সোচ্চার নিজস্বতা আছে তার, যা নীরবে গোপনে জমিয়ে রাখতেই ভালোবাসেন তিনি। আগের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে টেলিফোনে শুধু স্ত্রীকেই একবার জানিয়েছিলেন দুশ্চিন্তার কথা। ৮ উইকেট নিতে হবে ১৫৫ রানের মধ্যে- পারব কি? ‘অবশ্যই পারবে, তোমাকেই পাঁচ উইকেট নিতে হবে…।’ সেটাই নাকি তাতিয়ে দিয়েছিল সাকিবকে।

এদিন সকালে যখন একপাশ থেকে ওয়ার্নার মিরাজের শর্ট বলগুলো বাউন্ডারি-ছাড়া করতে থাকেন, অন্যদিক থেকে তখনও হাল ছাড়েননি সাকিব। সেঞ্চুরি করার পর ওয়ার্নারের ওই লম্ফ দেখার পরও উইকেট টু উইকেট বল করে গেছেন সাকিব। দেখেছিলেন বল বাউন্স করছে, বুঝেছিলেন সুইপ খেলছেন বেশি ওয়ার্নার, তাই ফিল্ডিংও সাজিয়েছিলে অন সাইডে। সাকিবের ওই সংগ্রাম দেখে মিরপুরের পিচের বোধ হয় মন গলে যায়। তাই তার নিচু হওয়া একটি বলকেই সুইপ খেলতে গিয়ে এলবিডবি্লউ হয়ে যান ওয়ার্নার। ওই একটা তোলপাড়েই হাল ভেঙে যায় অস্ট্রেলিয়ার। ভেঙে যায় স্মিথ-ওয়ার্নারের ১৩০ রানের জুটি। এর মধ্যে অবশ্য স্টেডিয়াম কাঁপানো কয়েকটি এলবিডবি্লউর আবেদন হয়েছিল সাকিব-তাইজুলে। কিন্তু আম্পায়াররা তাতে কর্ণপাত করেননি।
মেজাজ বিগড়ে দিতে এর মধ্যে স্লেজিংও চলেছিল! স্মিথের সঙ্গে একবার নয়, কয়েকবার কথাকাটাকাটি হয় তামিমের। আসলে এটাও এখন আধুনিক ক্রিকেটে গেম প্ল্যানিংয়ের অংশ, যেটা কি-না অস্ট্রেলিয়ানরাই আমদানি করেছে।

তামিম সেটাই তাদের ফিরিয়ে দিলেন। ‘ওরা এখন জানে, বাংলাদেশ আর চুপ করে থাকে না। ওরা আমাদের যেভাবে স্লেজিং করেছে, আমরাও তার পাল্টা দিয়েছি।’ মুশফিক ম্যাচ শেষে চোয়াল শক্ত করেই বলেছিলেন তা। ওয়ার্নার ফিরে যাওয়ার পরেই কিছুটা চাপের মুখে পড়ে যান অসি অধিনায়ক স্মিথ। সুযোগ বুঝে টাইট ফিল্ডিং সাজান মুশফিক। স্লিপ, শর্ট লেগ, সিলি পয়েন্ট, তিন কোনা থেকেই সাঁড়াশি আক্রমণ সাজানো হয় তার মধ্যে। সেখান থেকে উদ্ধার পেতেই কাট শট খেলতে গিয়ে সাকিবের বলে মুশফিকের গ্গ্নাভসে বন্দি হন স্মিথ। পালটাও যেন ছিঁড়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার। এর পর তাইজুলের বলে হ্যান্ডসকম্বের স্লিপে ক্যাচ।

আগের দিন মুখ সরিয়ে ক্যাচ ধরতে পারেননি যিনি, সেই সৌম্যই এদিন অসাধারণভাবে তা লুফে নেন। হাঁটু গেড়ে মাথা নামিয়ে দুই হাত ওপরে তুলে ক্যাচটি ধরেন। প্রচণ্ড গতির ওই ক্যাচ প্রথমে ঠেকিয়ে তারপর তালুবন্দি করেন সৌম্য। তাইজুলকে প্রতিটি বলেই কাছে এসে কাঁধ চাপড়িয়ে বলে দিচ্ছিলেন সাকিব, কোথায় বল ফেলতে হবে। নিজেও পিচের মার্ক করা জায়গাটি বুঝে নিয়েছিলেন। আর সেখানে বল ফেলেই ম্যাথু ওয়েডকে এলবিডবি্লউ করে নেন। তখনই সেই বিখ্যাত নাচ! দুই হাত দু’দিকে দিয়ে কোমর দুলিয়ে আনন্দে নাচতে থাকেন সাকিব। দিলি্ল থেকে এক সাংবাদিক বন্ধুর ফোন- ম্যাচ শেষে সাকিবকে জিজ্ঞাসা করবেন, ওই নাচের নাম কী? করেওছিলাম। উত্তর মিলেছিল, ‘ধরে নেন সাকিব ড্যান্স…।’ ইংল্যান্ড সিরিজে বেন স্টোকসকে আউট করার পর সাকিবের ‘স্যালুট’ সেলিব্রেশন বিখ্যাত হয়েছিল। এবার বোধ হয় এই ‘সাকিব ড্যান্স’টাই বিখ্যাত হয়ে যাবে। ওই সময় রোটেশনের মতো একটি সাকিব আর একটি তাইজুলের সাফল্যে তখন গোটা স্টেডিয়ামে বাঘের গর্জন!
১৯৫ রানে ৭ উইকেট। ৭০ রান তুলতে হবে অস্ট্রেলিয়ার, হাতে তাদের মাত্র ৩ উইকেট। কিন্তু ড্রেসিংরুমে ফিরেও যেন চিন্তা কাটছিল না। কারণ সাকিব জানতেন, ম্যাক্সওয়েল রয়েছেন ক্রিজে। ৬৬ রান দরকার, তার মধ্যে ম্যাক্সওয়েল দুমদাম ছক্কা মেরে দিলেই ম্যাচ উল্টে যেতে পারে। তাই যখন ম্যাক্সওয়েল কাট করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান সাকিবের বলে, তখন উদগ্রীব হয়ে থাকা গোটা দেশই যেন ভাগ্যলিখন পড়ে নেয় এই টেস্টের। শেষ দিকে মিরাজের বলে কামিন্সের দুটি ছক্কা আর বাউন্ডারিতে কপালে যে দু-একটা ভাঁজ পড়েনি, তা বলা যাবে না। কেননা, তখন মাত্র ২১ রান দূরে ছিল অসিরা। তবে মুশফিক নিশ্চিত ছিলেন, একটি ভালো বলেই সব পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে নিভিয়ে দেওয়া যাবে। হয়েছিলও তাই, তাইজুলকে অন্যপাশ থেকে ফিরিয়ে এনেই ঐতিহাসিক জয়ের শেষ পাতাটি সাজিয়েছিলেন মুশফিক।

কামিন্সকে ননস্ট্রাইকে রেখে ইনজুরিতে পড়া হ্যাজেলউডের অসাবধান ‘পা’ বেছে নেন তাইজুল। তবে এদিন মেসির মতোই খেলেছেন সাকিব। নিজে যেমন উইকেট নিয়েছেন, তেমনি উইকেট নেওয়াতে তাইজুলকে সাহায্যও করেছেন। একসময় তিনিই ছিলেন মাঠের ছায়া অধিনায়ক। অসিদের সঙ্গে সাড়ে তিন দিনের এই লড়াই শুধুই ক্রিকেটীয় দক্ষতার মধ্যে নিহিত ছিল না। এটা ছিল ক্রিকেট মস্তিষ্কের প্রতিযোগিতাও। যেখানে নিজেদের সুন্দরভাগে গুছিয়ে, পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, ভেতরের বিশ্বাসগুলোকে অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন এই ইতিহাস লিখেছে টাইগারররা। তবে কিছুটা এখনও বাকি আছে, সব ‘প্রথম’ যে এখনও হয়ে ওঠেনি। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় তো হলো, অপেক্ষা এখন প্রথম সিরিজ জয়েরও।

Leave a Reply

Top