You are here
Home > প্রচ্ছদ > তুফান কারও কারও নিকট ছিল ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’

তুফান কারও কারও নিকট ছিল ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’

স্টাফ রিপোর্টারঃ বগুড়ায় ধর্ষিতা কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় আলোচিত তুফানের ভাই মতিনের আস্তানায় চলত বিচার। প্রতি রাতেই কারও না কারও ওপর চালানো হতো বর্বর নির্যাতন। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চকসূত্রাপুরে তার ‘নিরাপদ দুর্গ’ খ্যাত আস্তানায় শহরের জায়গাজমিসহ নানা বিষয় নিয়ে বিচারের আয়োজন হতো। পাশাপাশি মদ-জুয়ার রমরমা আসরও বসত সেখানে। অন্যদিকে ছোট ভাই তুফান গোটা শহর চষে বেড়াত তার হোন্ডা বাহিনী নিয়ে। শহরের যে কোনো প্রান্তে ত্রাসের রাজত্ব করে অন্যের জমি দখল, বিচার, সালিস, সন্ত্রাস সৃষ্টি, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্যসহ টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে সে। জেলা শ্রমিক লীগের প্রভাবশালী একটি গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ফুলে-ফেঁপে বেড়ে ওঠে তুফান সরকার। বগুড়ায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক কিশোরী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর ধর্ষিতা ও তার মাকে অমানবিক নির্যাতনসহ মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় অভিযুক্ত তুফান সরকার গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তার অপরাধজগতের নানা অজানা কাহিনী বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। চোরাচালান, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ-অপকর্মেই সে ছিল অপ্রতিরোধ্য। কারও কারও কাছে তুফান ছিল ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’। তাদের যে কোনো অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে, এমনকি অনেকের বাড়ির কাঁচাবাজার, বাজারের মাছ পর্যন্ত পৌঁছে যেত তুফানের টাকায়।

জেলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে রয়েছে তুফানের  সুসম্পর্ক। তুফান সরকার ২০১৫ সালে শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বাণিজ্য মেলার নামে প্রায় দেড় বছর জুয়া পরিচালনা করে। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই কয়েক কোটি টাকা আয় করে সে। চোরাই গাড়ি কেনাবেচারও অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রায় দুই বছর বগুড়া শহরে অন্তত ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদাবাজি করেছে সে। তার স্টিকার ছাড়া কোনো রিকশা সড়কে চলতে পারত না। প্রতিটি রিকশায় এককালীন দেড় হাজার টাকা ও দৈনিক ২০ টাকা চাঁদা নেয়া হতো। শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকেই প্রতিদিন তুফানের আয় ছিল অন্তত ১০ হাজার টাকা।

ধর্ষিতা কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করার পর আলোচিত দুই ভাই তুফান ও মতিন সরকারের পরিবারে গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা রাতে কেউ বাড়িতে থাকছে না। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কেউ কোনো কথাও বলছে না। বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বসবাসকারীরাও কেউ আর মুখ খুলছেন না। তুফান জামিনে মুক্ত হয়ে ফিরলে আবারও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করবে এই ভয়ে এলাকাবাসী ভীত হয়ে আছেন। তুফান সরকারের বড় ভাই মঙ্গলবার রাতে বগুড়া শহর যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল মতিন সরকারও গ্রেফতার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছে।

জানা যায়, বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর চামড়া গুদাম লেনে তুফান ও মতিন সরকারের বাসায় কেউ নেই। শহরবাসীর মুখে মুখে ফিরছে মতিন আর তুফানের নানা কাহিনী। এলাকায় ঘুরে তাদের সম্পর্কে পাওয়া গেছে নানা তথ্য। তুফান সরকার ১০ বছর আগেও চকসূত্রাপুরে ঢাকা বেকারি নামের একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করত। আর তার বড় ভাই আবদুল মতিন ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের কারণেই বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর, বাদুড়তলা মাদক এলাকা হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় হেরোইন ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের পাইকারি ব্যবসা করে তারা।

২০০০ সালের আগেই মতিন বগুড়া শহরে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত পায়। পাড়ার ছিঁচকে সন্ত্রাসী মতিন বগুড়া জেলা যুবলীগের কর্মী হিসেবে কর্মকাণ্ড শুরু করে। যুবলীগের নাম-পরিচয়ে চকসূত্রাপুর এলাকায় দাপটের সঙ্গে মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে সে। মাদকের ব্যবসা করে অল্প সময়ের মধ্যে সে অবৈধ টাকার কুমির হয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই ভাই তুফান সরকার ও মতিন সরকার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শ্রমিক লীগ ও যুবলীগের পদ বাগিয়ে নেয়। পর্যায়ক্রমে আবদুল মতিন বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্ম-সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) ও ছোট ভাই তুফান সরকার বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) হয়ে যায়। তুফান সরকারের পেছনে কাজ করেন জেলা শ্রমিক লীগের দাপুটে নেতারা। দুই ভাই দুই পদ নিয়ে দলের পরিচয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। ত্রাসের রাজত্ব করে অন্যের জমি দখল, বিচার, সালিস, সন্ত্রাস, ছিনতাই, মাদক, এমনকি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তারা জড়িয়ে পড়ে। বাবা মজিবর সরকার ছিলেন রিকশাচালক। অথচ তার দুই সন্তানই মাদক বিক্রি করে কিনেছে দামি একাধিক গাড়ি।

তুফান সরকার ২০১৫ সালে ফেনসিডিল ও বিপুল অঙ্কের টাকাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়। পরে হাজত খাটার পর জামিনে মুক্ত হয়। মাদক ব্যবসা থেকে নিজেকে কিছুটা আড়াল করে গঠন করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতি। এরপর শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক কর্মীকে লাঠি হাতে রিকশা থেকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব দেয় সে। তার লোকজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধরে চকসূত্রাপুরে তুফানের আস্তানায় নিয়ে যেত। এরপর সমিতিতে ভর্তি বাবদ আদায় করা হতো তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া শহরে চলাচলের জন্য প্রতিদিন অটোরিকশা থেকে আদায় করা হতো ২০ টাকা করে চাঁদা। এভাবে ছয় হাজারের বেশি অটোরিকশা থেকে আদায় করা হয়েছে দুই কোটি টাকার ওপরে। আর এখান থেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয় তুফান। চকসূত্রাপুরে বিল্ডিং বাড়ি, দুটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কার এবং শহরের চকজাদু সড়কে অন্যের জমি দখল করে কোটি টাকা ব্যয়ে দোকানের মালিক বনে যায় তুফান সরকার।

রিকশাচালক মজিবর সরকারের সপ্তম ছেলে তুফান সরকার কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়ে ওঠে এলাকার ডন। আর এই ডন হয়ে ওঠার পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তার বড় ভাই যুবলীগ নেতা মতিন সরকার। মতিন বগুড়া শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পুলিশের তালিকাভুক্ত। মতিনের বিরুদ্ধে এখনো রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। সন্ত্রাসী মতিন বগুড়া শহরে নাইন এমএম মতিন ওরফে কসাই মতিন ওরফে পিস্তল মতিন হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে মতিন কয়েক বছরের মধ্যে বাগিয়ে নিয়েছে জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ। আবদুল মতিন ২০০০ সালে পিস্তলসহ গ্রেফতার হয় এবং ২০০৭ সালে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। ওই মামলায় মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে নিজেকে পলাতক দেখায় সে। ১৯৯৮ সালে চকসূত্রাপুর এলাকার মো. রসুল, ২০০১ সালে একই এলাকার আবু নাসের উজ্জ্বল ও ২০১১ সালে বগুড়া শহরের মাটিডালির বাণিজ্য মেলায় শফিক চৌধুরী হত্যার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। ২০১২ সালে র‌্যাব-১২ বগুড়া ক্যাম্পের সদস্যরা মতিনকে মাদক ও নগদ টাকাসহ গ্রেফতার করে। পরে সে-যাত্রায় বেশ কিছুদিন জেল খেটে জামিনে মুক্ত হয়ে আসে সে। ২০১৫ সালে এসে চকসূত্রাপুর এলাকায় মাদক বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন হন মোঃ ইমরান। ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িতে বলে মতিন ও তুফানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ও মাদক মামলা রয়েছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর মতিন কৌশল পাল্টিয়ে চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিক সমিতির পদ বাগিয়ে নেয়। আর এই দুই পদকে পুঁজি করে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে সে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এলাকায় জায়গাজমি দখল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে মতিন। তার প্রভাব লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ায় শুধু বগুড়া শহর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জমিজমার বিচার নিয়ে লোকজন আসতে থাকে মতিনের কাছে। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চকসত্রাপুরে তার আস্তানায় সালিস চলত। পাশাপাশি সেখানে বসত মদ ও জুয়ার আসর।

প্রতিবাদে ঝাড়ুমিছিলঃ ছাত্রী ধর্ষণ এবং পরে মা-মেয়েখে ন্যাড়া করার প্রতিবাদে এবং তুফান সরকারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল জেলা মহিলা দল ঝাড়ুমিছিল করেছে। মিছিলটি জেলা বিএনপি অফিস থেকে শুরু হয়ে সদর পুলিশফাঁড়ির সামনের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে অংশ নেন মহিলা দলের নেত্রী নাজমা আক্তার, বিউটি বেগম, স্বপ্না, কহিনুর, শেফালী, জেবা, পলিন, লাকী প্রমুখ। একই দাবিতে নারী মুক্তি সংসদ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) শহরে মানববন্ধন করে। এতে অংশ নেন সালেহা সুলতানা, অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক, আবদুর রউফ প্রমুখ।

তুফান, স্ত্রী ও শাশুড়ি ফের রিমান্ডেঃ কিশোরী ধর্ষণ ও মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় করা মামলায় তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা সরকার, শাশুড়ি রুমি খাতুনকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বগুড়ার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার আসামিকে হাজির করে সাত দিন রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে তুফান সরকার ও তার সহযোগী মুন্নার দুই দিন করে এবং তুফানের স্ত্রী ও শাশুড়ির এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। জোরপূর্বক সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর গ্রহণের মামলায় তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়। মামলার অপর আসামি বগুড়া পৌরসভার নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকি চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছে। বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী আসামিদের রিমান্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া তিনি জানান, নরসুন্দর (নাপিত) জীবন রবিদাস আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৭ জুলাই কলেজে ভর্তি করার কথা বলে কিশোরীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে তুফান সরকার। এ ঘটনার পর ২৮ জুলাই দুপুরে ওই এলাকার পৌর কাউন্সিলর রুমকি ও তার সহযোগীরা বিচারের নামে ওই কিশোরী ও তার মাকে ধরে নিয়ে আটকে রেখে মারধর করে মাথা ন্যাড়া করে দেয়। বগুড়া সদর থানায় এসব ঘটনায় কিশোরীর মা মুন্নী বেগম বাদী হয়ে অপহরণ, ধর্ষণ ও মারধরের অভিযোগে মামলা করেন।

Leave a Reply

Top