You are here
Home > দূরনীতি ও অপরাধ > খুনির চেহারার সঙ্গে মিল থাকায় ১ বছর ধরে জেলে!

খুনির চেহারার সঙ্গে মিল থাকায় ১ বছর ধরে জেলে!

আদালত প্রতিবেদকঃ সন্দেহভাজন খুনির চেহারার সঙ্গে তাঁর চেহারার কিছুটা মিল রয়েছে, শরীরের গঠনও প্রায় একই রকমের—মোহাম্মদ শাহজামানকে গ্রেপ্তার করার প্রাথমিক কারণ ছিল এটি। সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যায় জড়িত সন্দেহে গত বছরের ১১ জুন চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার শীতল ঝরনা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

শাহজামানকে গ্রেপ্তারের ১৫ দিন পর ধরা পড়েন সেই সন্দেহভাজন খুনি, যাঁর চেহারার সঙ্গে শাহজামানের চেহারার কিছুটা মিল রয়েছে। তাঁর নাম আবদুল মোতালেব ওরফে ওয়াসিম। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে মাহমুদা খুনে কারা অংশ নেন তার বর্ণনা রয়েছে। তিনি শাহজামানের নাম বলেননি। পরে পুলিশের তদন্তেও শাহজামানের নাম আসেনি। এখন পুলিশ বলছে, ওই যুবকের (শাহজামান) জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। মামলার অভিযোগপত্রে তাঁকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে গিয়ে চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মাহমুদা খানম। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ও আর নিজাম রোডের বাসা থেকে বের হয়ে ছেলেকে নিয়ে জিইসি মোড়ের দিকে যাচ্ছেন মাহমুদা। একই সময় রাস্তার অপর প্রান্ত থেকে জিনস প্যান্ট ও চেক শার্ট পরা এক যুবককে মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে মাহমুদার পিছু নিতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি রাস্তার বিভাজক (ডিভাইডার) অতিক্রম করে ঘটনাস্থলের (রাস্তার যে অংশে খুনের ঘটনা ঘটে) দিকে এগিয়ে যান।

ঘটনার পাঁচ দিন পর (১১ জুন) জিনস প্যান্ট ও চেক শার্ট পরা ওই যুবক সন্দেহে শাহজামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মোঃ ইকবাল বাহার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, খুনে অংশ নেওয়া তিনজনের একজন ‘মূল আসামি’ হতে পারেন ওই যুবক (শাহজামান)। এর ১৫ দিন পর ২৬ জুন আবদুল মোতালেব ওরফে ওয়াসিম (শাহজামানের চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে) এবং আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ওই দিনই সংবাদ সম্মেলন করে আবার পুলিশ কমিশনার বলেন, কামরুল শিকদার ওরফে মুছার নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে ওয়াসিম, আনোয়ারসহ সাত-আটজন অংশ নেন। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁরা বলেন, মুছার নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ওয়াসিম, আনোয়ার, মো. রাশেদ, নবী, মোঃ শাহজাহান, মুছা ও মোঃ কালু অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে নবী ও রাশেদ গত বছরের ৪ জুলাই রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটর সাইকেলে ছিলেন ওয়াসিম, মুছা ও নবী। মাহমুদাকে ছুরিকাঘাত করেন নবী। অস্ত্র সরবরাহ করেন এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা। তাঁদের মধ্যে মুছা ও কালুকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। আসামিদের জবানবন্দি ও তদন্তে শাহজামানের জড়িত থাকার তথ্য পায়নি পুলিশ।

শাহজামানের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। তিনি অবিবাহিত। তাঁর মা-বাবা গ্রামে থাকেন। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় চাচার বাসায় থাকতেন তিনি। জমি বিক্রির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন শাহজামান। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা নেই।

চলতি বছরের ২৯ মে এই মামলার ধার্য দিনে আদালতে হাজির হন শাহজামান। পুলিশের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘বিনা দোষে আর কত দিন কারাগারে থাকব? আমার তো কোনো অপরাধ নেই।’

চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি মোঃ ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোনো মামলায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলে বা দোষী হলে অভিযোগপত্রে আসামি করে। আর নির্দোষ হলে মামলা থেকে বাদ দেয়। যেহেতু শাহজামান ঘটনায় সঙ্গে জড়িত নন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, তিনি জামিনে মুক্তি পেতে পারেন। মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় হয়তো বিজ্ঞ আদালত জামিন মঞ্জুর করেননি।

মাহমুদা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, তদন্তে শাহজামানের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগপত্রে তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে। তিনি জামিনে ছাড়া পেলে পুলিশের কোনো আপত্তি নেই। তবে অভিযোগপত্র কবে দেয়া হবে, তা বলেননি তদন্ত কর্মকর্তা।

শাহজামানকে গ্রেপ্তারের আগে গত বছরের ৮ জুন (মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর) প্রথমে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আবু নছর ওরফে গুন্নু নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। পরে গুন্নুর স্ত্রী পারভীন আক্তার সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ৩০ লাখ টাকা নিয়ে পুলিশ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁর স্বামীকে এ মামলায় জড়িয়েছে। তাঁর স্বামী হাটহাজারীর একটি মাজারের খাদেম।

২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান আবু নছর। মাহমুদা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আবু নছরের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে চলতি বছরের ৫ জুন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে শাহজামানের জামিনের আবেদন করা হয়। জামিন পাননি তিনি। তাঁর আইনজীবী সৈয়দ মোকতার আহমেদ বলেন, এখন তাঁরা উচ্চ আদালতে যাবেন।

শাহজামানের বাবা মো. শাহজাহান মুঠোফোনে বলেন, দোষ না করেও ছেলেকে এক বছর ধরে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তিনি ছেলের মুক্তি চান।

এদিকে মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের পর গত বছরের ২৪ জুন মধ্যরাতে ঢাকার বনশ্রী এলাকার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে আবার বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। পরে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ‘বাবুলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হলো।’

Leave a Reply

Top