You are here
Home > জাতীয় > এবার অর্থমন্ত্রীর পক্ষে সরব তোফায়েল

এবার অর্থমন্ত্রীর পক্ষে সরব তোফায়েল

স্টাফ রিপোর্টারঃ নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনটি আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনটিই বহাল থাকবে। পরিবর্তন হতে পারে ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবটিও।

জাতীয় সংসদে এবং সংসদের বাইরে নতুন ভ্যাট আইন ও আবগারি শুল্ক নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর সরকার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যাচ্ছে। আর বাজেটের এসব পরিবর্তন হলে সেটি হবে দেশের বাজেট ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২৮ জুন পর্যন্ত। জাতীয় সংসদে গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার। ভ্যাট নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, আমার মুখে না বলাই ভালো। প্রধানমন্ত্রীই বলবেন।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২৮ জুনের পর বাংলাদেশের মানুষ বাজেটের শুধু প্রশংসা করবেন না, মানুষ বলবেন যে এটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বাজেট। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভালো জানেন, এ দেশের মানুষ কী চায়। তিনি ২৮ জুন বাজেটের ওপর
সমাপনী ভাষণ দেবেন এবং সেদিনই অর্থমন্ত্রীকে বলবেন এটা করেন, ওটা করেন।

বাজেট সমালোচনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে কটাক্ষ করে কয়েক দিন ধরে সরকারদলীয় সাংসদেরা তীব্র ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে সরকারের শরিক দল জাতীয় পার্টির সদস্যরাও যোগ দিয়েছেন। এমনকি অর্থমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণও করা হয়েছে। তবে গতকাল জাতীয় সংসদের চেহারা ছিল ভিন্ন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অর্থমন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখার পর গতকাল অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে আর বক্তব্য তেমন শোনা যায়নি। অর্থমন্ত্রী এ সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী এ সময় এ-ও বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে প্রজ্ঞাবান, সম্মানী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই অর্থমন্ত্রী আরও বাজেট দেবেন। কারণ, তাঁর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থা আছে।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও কাজী ফিরোজ রশীদ গত মঙ্গলবার সংসদে অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়ে গেছে বলে প্রশ্ন তোলেন। মুহিতের কাছে আর কোনো বাজেট চান না বলেও জানান তাঁরা। তাঁদের এমন মনোভাবের জবাব বাণিজ্যমন্ত্রী গতকাল সমানভাবেই দেন দুজনকে। জিয়াউদ্দিন বাবলুর উদ্দেশে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর বয়স নিয়ে কথা বলবেন না। আপনার নেতা এইচ এম এরশাদের বয়সের কথা বিবেচনা করুন, যিনি আপনার মামাশ্বশুর। যিনি আপনাকে একবার মহাসচিব বানান, তারপর আবার রুহুল আমিন হাওলাদারকে বানান। যাঁর বয়স অর্থমন্ত্রীর চেয়ে পাঁচ বছর বেশি।’

বাণিজ্যমন্ত্রী আবার বলেন, ‘বাবলু কী করে ভুলে গেলেন তাঁর (এরশাদ) বয়স ৮৬ বছরের বেশি। তিনি (বাবলু) যদি তাঁর নেতাকে বলতেন আপনার বয়স হয়েছে, আপনি পদত্যাগ করুন। আসলে একজন সম্মানিত মানুষকে সম্মান দিতে হয়। বাবলু বলেছেন, এখন বিদায় হোন। আপনাদেরও অর্থমন্ত্রী ছিলেন উনি (অর্থমন্ত্রী)। এ পর্যন্ত ১১টা বাজেট দিয়েছেন।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী যে বাজেট দিয়েছেন, তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত। মন্ত্রিসভায় আমিও থাকি। কোনো কথা থাকলে মন্ত্রিসভাই সঠিক জায়গা। অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন কেন? আমারও পদত্যাগ দাবি করতে পারেন। আমিও এর অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো সমস্যা থাকলে তিনি দেখবেন। আলোচনা অবশ্যই করবেন। তা হতে হবে গঠনমূলক। বাজেট কি সব শুধু নেতিবাচক হয়েছে? ইতিবাচক কিছুই নেই?’

অর্থমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ তোফায়েল বলেন, ‘একজন মানুষ কী পরিমাণ লেখাপড়া জানেন! সম্মানিত মানুষকে সম্মান দিতে হয়। কতগুলো বই লিখেছেন তিনি! বাজেট সবার। আর অর্থমন্ত্রী আমাদের মুখপাত্র। আমাদের পক্ষে তিনি বাজেট পেশ করেন। এটা প্রস্তাব। চূড়ান্ত কিছু নয়।’

জিয়াউদ্দিনের উদ্দেশে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি অন্যায়কে সমর্থন করি না। ব্যাংকে কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর প্রত্যাশা মানুষ করে না। জিয়াউদ্দিনও তো ব্যাংকের মালিক।’

এরপর জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদের দিকে বক্তব্য ঘুরিয়ে দেন তোফায়েল আহমেদ। বলেন, আরেকজন অবশ্য শেয়ারবাজারের সঙ্গে জড়িত। কয়টা ব্রোকার হাউস জানি আছে, প্রশ্নটি করে অন্য সাংসদদের কাছ থেকে জবাবটি চান তোফায়েল। অন্যরা ‘দুইটা, দুইটা’ বলতে থাকলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, দুইটা। ভালো, ভালো।’

বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলে রাজিউদ্দিন রাজু (নরসিংদী) এবং কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম মিছিল করেছিলেন বলে স্মরণ করেন তোফায়েল। বলেন, ‘ফিরোজ প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। অবদান অনেক, মন্ত্রীও ছিলেন। অভিজ্ঞতা আছে। সব ক্ষেত্রেই তাঁর অভিজ্ঞতা আছে।’

চালের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিলমালিকেরা বাজারে চাল ছাড়ছেন না। আমরা শুল্ক কমিয়েছি। প্রতি কেজিতে ৬ টাকা দাম কমবে। এটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, অর্থমন্ত্রী জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সবার ওপর এই ভ্যাট আরোপের পরিণতি কী হতে পারে তা তিনি জানেন না, তা নয়। এটা ঠিক যে বড় ধরনের অব্যাহতিও আছে। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর আঘাত আসবেই। অর্থমন্ত্রী সংসদের আলোচনা শুনেছেন। নিশ্চয়ই পুনর্বিবেচনা করবেন।

ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক নিয়ে মেনন বলেন, এ শুল্কের নাম বদলালেই যথেষ্ট হবে না। ভ্যাটের আওতা না বাড়িয়ে সহজে আদায় করা যায় এমন করের ওপরই বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো আবগারি শুল্ক। এক বছরের বাজেটের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানান মেনন। তিনি বলেন, এ টাকা ফেরত আনা যাবে না আর ভ্যাট-করের মহোৎসব চলবে, তা হতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের ছাড় দিচ্ছেন।

নিজের মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বাংলাদেশ বিমান প্রসঙ্গে মেনন বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একে লিমিটেড কোম্পানি করা হয়েছে। এখানে জবাবদিহি এবং জনবল কোনোটাই নেই। ফলে অভিযোগ আসছে। ইতিমধ্যে বিমানকে জরুরি সার্ভিস ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, যারা বিমানের আমূল সংস্কারের জন্য সুপারিশ করবে। ওই সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হবে। পরে সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

সরকারি দলের নেতাদের অর্থমন্ত্রীর সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিরোধী দলের ভূমিকায় নামতে চাইছে কি না, সে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যাঁরা নৌকায় ছিলেন, অনেকে এখন আর আটকে থাকতে চাইছেন না। মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবিত বাজেট পাস হওয়ার পর যেসব বক্তৃতা হচ্ছে, সেসব শুনতে ভালো লাগছে। তিনি বলেন, সব সাংসদের বক্তব্যের স্পিরিট দেখলে মনে হয় এবার হ্যাঁ-না ভোটের দরকার হবে না।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে মূলধন দেয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করে ফখরুল ইমাম বলেন, এটা অনৈতিক কাজ। আর ভ্যাট নিয়ে তিনি বলেন, জ্ঞানীরা বলেন ভ্যাট ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রস্তাবিত ভ্যাটে সবকিছুর দাম বাড়বে। অনেক কিছু আবার কমবেও। সেগুলো হচ্ছে টাকা, মানুষের আয় আর সংসারে কর্তার মূল্য।

ফখরুল ইমাম আরও বলেন, ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক, সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানো, শেয়ারবাজারের নিম্নগতি, চালের মূল্যবৃদ্ধি—কোনোটাই মধ্যবিত্তের জন্য সুখকর নয়। মোটা চাল এখন ৪৮ টাকা। মজুতও সর্বনিম্ন। চালের মজুত বাড়াতে হবে। বাস্তবায়ন হয় না বলেই প্রতিবছর বড় বাজেট দেওয়া হয় বলে মনে করেন তিনি।

সরকারদলীয় সাংসদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অর্থমন্ত্রী বয়সে প্রবীণ হলেও তাঁর মাঝে বয়সের ছাপ নেই। তিনি যে কয়টা বাজেট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, সব কটিতেই অনেক সাফল্য এসেছে।

সরকারি দলের ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভু বলেন, বাজেট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। কারা এসব করছেন, তা সবার জানা। যে ভাষায় মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করা হয়েছে, তাতে তাঁদের দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।

সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘সাংসদদের সমালোচনার ব্যাপারে যে সমালোচনা করলেন, নীতিগতভাবে তা তিনি পারেন না। আমরা যাঁরা মন্ত্রিসভায় নেই, আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় তিক্ত কথা দু-একটা বলে ফেললেও সেগুলোকে সহজভাবে নিতে হবে।’

চালের মজুত নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের সমালোচনা করে রুস্তম আলী বলেন, তিনি কী করেছেন? ১০ লাখ টন মজুত থাকা উচিত। কিন্তু গুদামগুলোতে তা নেই। কোটি কোটি মানুষ আজ সমস্যায়।

অর্থমন্ত্রীকে মার্জিত ও বিরল ব্যক্তিত্বের মানুষ উল্লেখ করে রুস্তম আলী বলেন, ব্যাংক খাতে কমিশন গঠন ও দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমনের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রীকে প্রত্যক্ষ করে হাত দিতে হবে, পরোক্ষ করে নয়। সমাজ বৈষম্যপূর্ণ হয়ে গেছে। ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৯০ শতাংশ সম্পদ। এভাবে দেশ চলতে পারে না।

বাজেটে বড় সংশোধন আসছে

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে বড় সংশোধনে হাত দিয়েছে এনবিআর। বিদ্যমান ভ্যাট আইনটি বহাল থাকলে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে ১৫ ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর দেড় থেকে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট থাকবে। আবার ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি প্যাকেজ ভ্যাটও অব্যাহত থাকবে।

দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পুরোনো আইনটি বহাল রাখা হলেও নতুন আইনের অনলাইনে বাধ্যতামূলক ভ্যাট রিটার্ন, কর পরিশোধসহ বিভিন্ন ধারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনলাইন নিবন্ধন, ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন কেনাসহ ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য সময় বেঁধে দেবে এনবিআর।

পুরোনো আইন বহাল থাকলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে কৌশলও ঠিক করছে এনবিআর। বাজেটে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে। প্রয়োজনে পরে সংশোধন করে লক্ষ্য কমিয়ে আনা হবে।

এদিকে বহুল আলোচিত ব্যাংক হিসাবের ওপর আবগারি শুল্কের প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হতে পারে। এর ফলে ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক হিসাব থাকলে আগের মতোই ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক বহাল থাকবে। অর্থমন্ত্রী ৮০০ টাকা প্রস্তাব করেছিলেন। ১ লাখ টাকার কম থাকলে কোনো আবগারি শুল্ক বসবে না—অর্থমন্ত্রীর শুধু এই প্রস্তাবটি রাখা হতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অপরিবর্তিত থাকবে।

ঈদের পর ২৯ জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাস হবে। এর আগে শুল্ক-করসংক্রান্ত প্রস্তাবের অর্থবিল পাস করা হবে।

Leave a Reply

Top