You are here
Home > অর্থনীতি > ইয়াবা নতুন কৌশলে পাচার হচ্ছে

ইয়াবা নতুন কৌশলে পাচার হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নাফ নদ দিয়ে ইয়াবা পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। কোন কাজ হচ্ছে না রাতের বেলায় মাছ ধরা সাময়িক বন্ধের ঘোষণায়ও। উল্টো ইয়াবা পাচারকারিরা নতুন নতুন কৌশল নিয়ে পাচারে গতি বাড়িয়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।

পাচারকারিরা এবার নাফ নদে মিয়ানমারের জলসীমা থেকে নাইলনের রশি দিয়ে টেনে পাচার করছে ইয়াবার চালান। বড়শির মত টেনেই আনা হচ্ছে ইয়াবা। এমনকি নাইলনের রশি দিয়ে সাবরাং দিয়ে এক চালানে ইয়াবা সাত লাখ চালানও পাচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেই সাথে ওপার থেকে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে প্লাস্টিক কনটেইনার গায়ে বেঁধে ডুবুরির মত নাফ নদী সাঁতরিয়ে।

রাতের বেলায় সরকারিভাবে নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণার পরেও মূলত ইয়াবা পাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ থেমে নেই। বরং ক্ষেত্র বিশেষে আরো বেড়েছে। দিনের বেলায় নৌকা দিয়ে মাছ ধরার সময়ও অবাধে চলছে ইয়াবা পাচারের কাজ। তদুপরি নির্দ্দেশ থাকা স্বত্বেও রাতের বেলায়ও নৌকা নিয়ে মাছ ধরা সম্পুর্ণভাবে বন্ধ হয়নি।

তবুও ইয়াবা পাচারকারিরা নাফ নদ দিয়ে ইয়াবার চালান পাচারে নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। সীমান্তের লোকজনের অভিমত, ইয়াবা পাচার ঠেকাতে নাফ নদীতে মাছ ধরা দিবারাত্রি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া দরকার।
নাফ নদ দিয়ে ইয়াবা কারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে পাচারের বিষয়টি এখনো অনেকের নিকট অজানা রয়েছে। তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, নিত্য নতুন কৌশলে ইয়াবার চালান পাচারের বিষয়টিও তার কানে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের নাফ নদী তীরের বাসিন্দা এবং হ্নীলা ইউনিয়নের মেম্বার জানান, নাইলনের লম্বা রশি দিয়ে মাছ ধরার মত করে ছুঁড়ে মেরে কন্টেইনার ভর্ত্তি ইয়াবার চালান টেনে আনা হচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমার থেকে দিনের বেলায়ও এখন রোহিঙ্গারা নৌকায় করে একদম ফ্রিষ্টাইলে আসছে। শুক্রবার বিকালে হ্নীলার নয়াপাড়া জেলে ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গা বোঝাই দু’টি নৌকা ভীড়ে। একটি নৌকা জাদিমুরার আমীর হামজার এবং অপরটি নয়াপাড়ার আবদুল আমীনের। ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গারা উঠার সময় এলাকার একদল যুবক তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় নৌকা দুটিতে রোহিঙ্গাদের আবার তুলে নেয় আদম পাচারকারি নৌকার মাঝিরা। তবে স্থানীয় যুবকরা ৫ জন নারী-বৃদ্ধকে ধরে ফেলে।

এসব রোহিঙ্গারা জানায়, তাদের সাথে মাথা পিছু চুক্তিতে নৌকায় তুলে পাচার করা হচ্ছিল। নৌকার মাঝিদ্বয় মাথাপিছু আদায় করে নিয়েছে মিয়ানমারের ৫৫ হাজার কিয়েত অর্থাৎ বাংলাদেশি ৪ হাজার টাকা করে। এসব রোহিঙ্গাদের শুক্রবারই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। এলাকাটিতে বৃহষ্পতিবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে একটি সচেতনতামূলক সভা হয়েছিল। এই সভার পরই স্থানীয় যুবকের দল এগিয়ে আসে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা বোঝাই নৌকা এসে সেদেশের জলসীমানায় এসে নোঙ্গর করে। সেখানে নৌকা থেকে পাচারকারীরা ডুবুরি সেঁজে পানিতে নেমে পড়ে। প্লাস্টিকের কন্টেইনার নিয়ে ইয়াবাসহ সাঁতার শুরু করে এপারের উদ্দেশ্যে। পাচারকারিরা এপারের সীমান্তরক্ষীদের দৃষ্টি এড়াতে অনেক সময় ডুবুরির মত করেই সাঁতার কাটে। এমনকি নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য মুখে বাঁশের চোঙ্গাও ব্যবহার করা হয়। এমনকি এরকম পদ্ধতি এবং নাইলনের রশি দিয়ে টেনে গত সপ্তাহে সাত লাখ ইয়াবার একটি বড় চালান পাচারেরও খবর রয়েছে। টেকনাফের সাবরাং খালের স্লুইস গেইটের দক্ষিণে চালানটি টেনে তুলা হয়। সেই চালান থেকে এক লাখ ইয়াবা খোয়া যায়। খোয়া যাওয়া এক লাখ ইয়াবা পরবর্তীতে ঠেলা জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় সাবরাং সিকদার পাড়ার বাসিন্দা আবদুর রহমান উদ্ধার করেন। এ ঘটনা নিয়ে সাবরাংয়ে কয়েক দফা বৈঠকও বসেছে।

লোকেমুখে প্রকাশ-ইয়াবার চালানটি সাবরাং ইউনিয়নের শামশুল আলম মেম্বারের। তবে শুক্রবার রাতে শামশুল আলমের সাথে মোবাইলে আলাপকালে তিনি একথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সিকদার পাড়ার আবদুর রহমান এক লাখ ইয়াবা পেয়েছিল বলে শুনেছিলাম। পরে কি হয়েছে তা জানিনা।

সেই সাথে তিনি জানান, আমি টেকনাফ থানার ওসির সামনে পবিত্র কোরান ছুঁয়ে শপথ করে বলেছি, এখন আমি কারবারে জড়িত নেই। আমি কারবার করলে আমার মাল কেউ খেতেও পারত না। এমন সাহস কারো নেই। ’ শামশু মেম্বার আরো বলেন, যা মালামাল আনছে আমাদের আরেক মেম্বারই আনছে। তার ভাইয়েরাও একই কারবার করে।

এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, রশি দিয়ে এবং সাঁতার কেটে ইয়াবা পাচারের উপযুক্ত অন্যান্য স্থান হচ্ছে নাফ নদীর হ্নীলা চৌধুরী পাড়ার দক্ষিণ পার্শ্বের এলাকা, আনোয়ার প্রজেক্টের পার্শ্ববর্তী আলীখালী, জগনুবাপের জমি, জাদিমুরা, মুচনি, হোয়াইক্যং গফুর মিয়ার খামার এলাকা, খারাংখালীসহ ইত্যাদি। নাফ নদের প্রস্থ যেখানে কম সেখানেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরার মত করে ইয়াবা ভর্ত্তি কন্টেইনার টেনে আনা হয়। তদুপরি নাফ নদীর প্যারাবন যেখানে বেশী সেখানেই এ পদ্ধতিতে মাল বেশী পাচার করা হয়।

গত কয়েকদিন ধরে এ বিষয়ে সন্ধান করে আরো জানা গেছে, রোহিঙ্গারা সাঁতারে অত্যন্ত দক্ষ। সাঁতার কেটেও ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে অতি সহজে। হ্নীলা জাদিমুরা এলাকার এক জেলে নানা স্ংস্থার সদস্যদের জিজ্ঞাসা ও হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছায় জানান, প্লাষ্টিকের কন্টেইনার বুকে পিঠে বেঁধে রোহিঙ্গারা ওপার থেকে সাঁতার কেটে এপারে নিয়ে আসছে ইয়াবা।

মোহাম্মদ শফি নামের একজন জেলে জানান, ‘এখানে কেউ কারো খবর রাখেনা। যার কাজ সেই করছে। পেশাজীবীরা তাদের নৌকা-জাল নিয়ে মাছ ধরছে। আবার মাছ ধরার ভান করে অনেকেই গুটি (ইয়াবা) পাচারও করে থাকে। রাতের বেলায় মাছ ধরা বন্ধের কথা শুনলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছেনা।

নাফ নদের বুকে জেগে উঠা চর (স্থানীয়ভাবে দিয়া বা দ্বীপ হিসাবে পরিচিত) যেখানে বেশী সেই চর এলাকায় সাঁতার দিয়ে ইয়াবা পাচারের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এক চর থেকে আরেক চরে উঠেই পাচারের কাজ সারা হচ্ছে। জেলে জানান, ‘ মাছ ধরার নৌকা অনেক দুর থেকে নাফ নদে দৃশ্যমান হয়। তাই বিজিবি’র ঝামেলা থাকে। কিন্তু নাইলনের রশি বা সাঁতরিয়ে পাচারে ঝুঁকি কম থাকে। ’ এই জেলের আরো অভিযোগ, ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমেও। পাচারে প্রতি কার্ড (১০ হাজারে এক কার্ড) হিসাবে চুক্তি করা হয়।

প্রসঙ্গত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২০ জুলাই ইয়াবা পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীতে সাময়িকভাবে মাছ ধরা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই টেকনাফ সীমান্তে ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিষয়ে ইতিবাচক নানান প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন সাধারণ জেলে থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। সীমান্তের লোকজন এরকম ঘোষণায় কিছুটা আশাবাদীও হয়ে উঠেছিল-ইয়াবা পাচার রোধের সাথে সাথে এবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশও বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছেটা কি-এমন প্রশ্নটি এলাকার সাধারণ মানুষের।

নাফ নদীতে সরকারি সিদ্ধান্তে রাতের বেলায় মাছ ধরা বন্ধের পরেও এ সময়ে ইয়াবা পাচার উল্টো বেড়ে গেছে। টেকনাফের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি’র এক তথ্যে জানা গেছে, গত জুন মাসে সীমান্তে ৮ লাখ ৮৪ হাজার পিচ ইয়াবা যেখানে আটক করা হয় সেখানে জুলাই মাসে আটকের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ২১ হাজার পিস। আর চলতি মাসের গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিজিবি আটক করেছে প্রায় ২ লাখ পিচ ইয়াবা। অনুরুপ এ সময়ের মধ্যে কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশসহ সবাই উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ইয়াবা আটক করেছে।

এতদিন ইয়াবা পাচার হয়ে আসছিল জেলেদের নৌকায় করে। পাচারকারিরাও পেশাদার জেলে সেঁজে মাছ ধরার ভান করে নির্বিঘ্নে পাচার করছিল ইয়াবা। তাই পরীক্ষামূলক ভাবে সরকারি সিদ্ধান্তে রাতের বেলায় মাছ ধরা বন্ধ করার ঘোষণায় পাচারকারিরা কোমর বেঁধে নেমেছে।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো মাঈনুদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে জানান, ইয়াবা পাচারকারিদের বিরুদ্ধে যতইনা কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ততই তারা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে পাচারে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, ‘ইয়াবা পাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। অনেক গবেষণা করেই সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষের কাছে মাছ ধরা বন্ধে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কিন্ত পাচারকারিরা নিত্য নতুন কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। তেমনি আইন প্রয়োগকারি সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে আসা-যাওয়াও করছে রোহিঙ্গারা। ’

জেলা প্রশাসক জানান, গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত কক্সবাজার জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও নাফ নদী দিয়ে ইয়াবার চালান এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, নাফ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে মাছ ধরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ বিষয়ক আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা একইদিন চট্ট্রগামের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

তবে নাফ নদী দিয়ে ইয়াবা কারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে পাচারের বিষয়টি এখনো অনেকের নিকট অজানা রয়েছে। তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, নিত্য নতুন কৌশলে ইয়াবার চালান পাচারের বিষয়টিও তার কানে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের নাফ নদী তীরের বাসিন্দা এবং হ্নীলা ইউনিয়নের মেম্বার জানান, নাইলনের লম্বা রশি দিয়ে মাছ ধরার মত করে ছুঁড়ে মেরে কন্টেইনার ভর্ত্তি ইয়াবার চালান টেনে আনা হচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান পাচার নিয়ে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক দলীয় এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ‘আমাদের আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যদি সোচ্চার হন তাহলে নাফ নদের ওপাড় থেকে একটি কাকও এপারে উড়ে আসতে পারবে না। ’

Leave a Reply

Top