আগস্টে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে ১০টি : অধিকার – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > প্রচ্ছদ > আগস্টে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে ১০টি : অধিকার

আগস্টে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে ১০টি : অধিকার

স্টাফ রিপোর্টারঃ মানবাধিকার সংস্থা অধিকার জানিয়েছে, গত আগস্ট মাসে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১০ জন। অধিকার জানিয়েছে, তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অগাস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত ও ২৫৫ জন আহত হয়েছেন। এই মাসে আওয়ামী লীগের ২৩ টি ও বিএনপি’র ২ টি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

অধিকারের প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে
১. অধিকার এর তথ্য মতে ২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে ১০ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২. ভিকটিম পরিবারগুলো অভিযোগ করে আসছে যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাঁদের স্বজনদের গুলি করে হত্যা করে তা ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ বা ‘গানফাইট’ নামে চালিয়ে দিয়েছে। ভিকটিম পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে বারবার অভিযুক্তদের বিচারের সম্মুখীন করার দাবি জানানো হলেও সরকারবিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অস্বীকার করছে ফলে এই ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়মুক্তি প্রবলভাবে বিরাজ করছে।
৩. গত ৪ অগাস্ট ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার নূরপুর গ্রামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জালালউদ্দিন বদু (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বদু চুরি ও মাদক মামলার আসামী ছিলেন এবং এলাকার লোকজন ধরে গণপিটুনি দেয়ার পর তাঁকে পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়। পরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের সময় সহযোগীদের গুলিতে বদু নিহত হন। অন্যদিকে বদুর হালিমা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী নির্দোষ। এলাকার লোকজন ষড়যন্ত্র করে তাঁর স্বামীকে ধরে পুলিশে দিয়েছে। তাঁকে পুলিশের হেফাজতে নেয়ার পর তিনি ঐ দিন রাতে থানায় গিয়ে তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে রাতের খাবারও দিয়ে আসেন। অথচ সকালে লোকজনের কাছ থেকে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
মৃত্যুর ধরন:
ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/বন্দুকযুদ্ধঃ
৪. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৯ জন ‘ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে ৭ জন পুলিশের হাতে এবং ২ জন র‌্যাবের হাতে নিহত হয়েছেন।
নির্যাতনে মৃত্যুঃ

৫. এই সময় ১ ব্যক্তি পুলিশের নির্যাতনে নিহত হয়েছেন।
নিহতদের পরিচয়ঃ
৬. নিহতদের মধ্যে ১ জন বিএনপি নেতা ও ৯ জন কথিত অপরাধী বলে জানা গেছে।
কারাগারে মৃত্যু

৭. অধিকার এর তথ্য মতে অগাস্ট মাসে ৪ জন ‘অসুস্থতাজনিত’ কারণে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন।
৮. কারাবন্দি ব্যক্তিকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। চিকিৎসার সুব্যবস্থা না থাকায় এবং কারাগার কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারনে আটক বন্দিদের মৃত্যু ঘটছে বলে অভিযোগ আছে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন শেষে কারাগারে পাঠানোর পর মৃত্যু ঘটছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতন, মর্যাদাহানিকর আচরণ ও জবাবদিহিতার অভাব
৯. পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন, হয়রানি, চাঁদা আদায় এবং হামলা করার অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার কারণে এইসব সংস্থার সদস্যরা দায়মুক্তি ভোগ করছে। দীঘদিন নির্যাতনের বিরুদ্ধে চালানো প্রচারভিযানের ফলশ্রুতিতে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদে ‘নি তন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩’ পাস হলেও আইনটির প্রয়োগ না থাকায় এই ব্যাপারে বাস্তব অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

১০. গত ২৯ জুলাই মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালকা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মনজুর আলম (৫৮) ও তাঁর সঙ্গী রশিদকে কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে। গোয়েন্দা পুলিশের অভিযোগ, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় গাড়ি তল্লাশীর সময় মনজুর আলম ও তাঁর সঙ্গী রশিদ একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁদের আট করা হয় এবং উভয়ের কাছ থেকে দেড় হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কক্সবাজার কারাগারে পাঠানো হয়। গত ২ অগাস্ট মনজুর আলম কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে ৬ অগাস্ট পুনরায় অসুস্থ হলে তাঁকে সদর হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি সেখানে মারা যান। কিন্তু কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ শাহীন আবদুর রহমান জানান, হাসপাতালে আনার আগেই মনজুর আলম মারা যান। মনজুর আলমের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ নিকসন বলেন, মনজুর আলম একজন আলু ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি টেকনাফে যান এবং কাজ শেষে ২৯ জুলাই কক্সবাজার ফেরার পথে টেকনাফকক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় গাড়ি তল্লাশী করে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে মনজুর আলমকে আটক করে গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর ওপর ব্যাপক নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়ার শর্তে পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবী করে আটককারী ডিবি পুলিশের সদস্যরা। ৩১ জুলাই রাতে মনজুর আলম গুরুতর অসুস্থ এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এই কথা বলে তাঁর মোবাইলে অন্য একটি মোবাইল ফোন (০১৯১৫৫৪৮২৩৫) থেকে ফোন করে টাকা চাওয়া হয়। তাঁদের দেয়া বিকাশ নাম্বারে (০১৭৭৯৭৭০৯০৮০) মনজুর আলমের স্ত্রী এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা পাঠান। তখনও তাঁর স্বজনরা জানতেন না মনজুর আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ৭ অগাস্ট কক্সবাজারের একজ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্টরা মনজুর আলমের মরদেহের সুরতাহাল রির্পোট তৈরী করেন। নির্বাহী ম্যাজি ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মৃতের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখমের চিহ্ন রয়েছে।

১১. নরসিংদীতে প্রীতম ভৌমিক নামে এক ১০ম শ্রেণীর স্কুলছাত্রকে (১৫) নরসিংদী থানা হাজতে নির্যাতন করে তাঁর মা দীপ্তি ভৌমিক এর হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১২ অগা এক সংবাদ সম্মেলন করে প্রীতমের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেন তাঁর বাবা প্রদীপ ভৌমিক। তিনি জানান, বিনাদোষে এবং বিনা ওয়ারেন্টে তাঁর ছেলে প্রীতম ভৌমিককে নরসিংদী থানায় নিয়ে ৪ দিন আটকে রেখে পা ওপরে দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে ৩ দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। লোহা ও কাঠের ডান্ডা দিয়ে প্রীতমকে পেটানো হয়েছে এবং ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে। এই নির্যাতন করে তাঁকে বলা হয়েছে যে তিনি তাঁর মাকে হত্যা করেছেন বলে আদালতে যেনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। স্বীকারোক্তি না দিলে প্রীতমকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়। ক্রসফায়ার এবং নির্যাতনের ভয়ে প্রীতম আদালতে তাঁর নিজ মাকে হত্যা করার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। প্রীতমের বাবা আরও জানান, এই ঘটনার পর তিনি প্রীত কে আদালতে হাজির করে তাঁকে মেডিকেল পরীক্ষার আবেদন জানালে আদালত প্রীতমের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। জবানবন্দিতে প্রীতম তার ওপর পুলিশের নির্যাতনের কথা আদালতকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোস্তাক আহমেদের বিরুদ্ধে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩’ ধারা ২ উপধারা ৮ অনুযায়ী মামলা গ্রহণ করে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রীতমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং এই ব্যাপারে রিপোর্ট তৈরী করে আদালতে দাখিল করার জন্য সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি এই রির্পোটটি অভিযোগকারী বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেয়। প্রীতমকে তাৎক্ষণিকভাবে সিভিল সার্জন বরাবর উপস্থাপনের জন্য কোর্ট ইন্সপেক্টরকে নির্দেশ দেয়া হয় এবং নরসিংদী পুলিশ সুপারকে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পুলিশ এই ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের করেনি। উল্লেখ্য গত ৮ জুলাই প্রীতম ভৌমিকের মা দীপ্তি ভৌমিকের শ তাঁদের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত দীপ্তি ভৌমিককে হত্যা করেছে বলে প্রীতমের পরিবার অভিযোগ করেছে।

গুম
১২. অধিকার এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ এর অগাস্ট মাসে ৬ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এঁদের মধ্যে ১ জনের লাশ পাওয়া গেছে, ১ জনকে পরবর্তীতে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে, ১ জন জীবিত ফিরে এসেছেন এবং এখনও পর্যন্ত ৩ জনের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
১৩. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকেরই কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ভিকটিমদের পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাই তাঁদের ধরে নিয়ে গেছে এবং এরপর থেকেই তাঁরা গুম হয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রথমে ধরে নিয়ে
যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকা করলেও পরবর্তীতে আটককৃত ব্যক্তিটিকে কোথাও ফেলে রেখে যাচ্ছে অথবা কোন থানায় নিয়ে সোপর্দ করছে অথবা আদালতে হাজির করছে অথবা গুম হওয়া ব্যক্তিটির লাশ পাওয়া যাচ্ছে।
একইভাবে বহু রাজনৈতিক কর্মী গুম হয়েছেন, যাঁদের এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভিকটিমদের
পরিবারগুলো তাঁদের স্বজনদের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া অনেক ভিকটিম পরিবার অনবরত সরকার, সরকার দলীয় নেতাকর্মী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।

১৪. সরকারের উচ্চমহল থেকে প্রতিনিয়ত গুমের বিষয়গুলো অস্বীকার করে বলা হচ্ছে যে, ভিকটিমরা নিজেরাই আত্মগোপন করে আছেন। সরকারের পক্ষ থেকে গুমের বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, গুম বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান এবং অব্যাহত আছে। গত ৩০ অগাস্ট সারা পৃথিবীতে জাতিসংঘ ঘোষিত “গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস” পালিত হয়েছে। বাংলাদেশেও এই দিনটিতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের ডাক এক সভার আয়োজন করে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় অধিকারএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা মিছিল-সভা-সমাবেশের অয়োজন করে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও সহিংসতা অব্যাহতঃ
১৫. অধিকার-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অগাস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত ও ২৫৫ জন আহত হয়েছেন। এই মাসে আওয়ামী লীগের ২৩ টি ও বিএনপি’র ২ টি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৪ জন নিহত ও ২১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরদিকে, বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

১৬. ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘোষণা সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থতার কারণে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং দুর্বৃত্তায়ন বাংলাদেশে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সব সরকারের আমলেই দুর্বৃত্তায়ন লক্ষ্য করা গেছে। সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত অন্যায় স্বার্থসিদ্ধির জন্য তরুণদের দলীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে এবং বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় সেইসব দলের সমর্থক তরুণদের অংশ নিতে দেখা গেছে। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি’’র প্রতারণামূলক ও বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টার কারনে ক্ষমতাসীনদলের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং সারাদেশে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকা- ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকায় এবং অগণতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনার ফলে যে সহিংস দুর্বৃত্তায়নের ঘটনা ঘটছে তার প্রায় সবগুলোই ঘটছে সরকারিদলের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে। সারাদেশে তাদের অপরাধমূলক কর্মকা-, দুর্বৃত্তায়ন ও সহিংসতা অব্যাহত আছে, যেমন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জমি দখল, পুলিশের ওপর হামলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা, নারীদের ওপর যৌন হয়রানী ও ধর্ষণ ইত্যাদি। এছাড়া তারা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন অন্যায় স্বার্থ হাসিলকে কেন্দ্র করে অসংখ্য অন্তর্দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিনিয়তই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটছে। এই সময় তাদেরকে দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে, যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছাত্র, ভিন্নমতালম্বী ও বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। এইসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ ক্ষমতাসীনদলের নেতাকর্মীদের হয় সহায়তা করছে নয়তো অসহায় ভূমিকা পালন করছে। অসংখ্য ঘটনার মধ্যে নিচে ক্ষমতাসীনদলের নেতাকর্মীদের দুর্বৃত্তায়ন ও সহিংসতার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

১৭. গত ৫ অগাস্ট চট্টগ্রামের হাজী মহসিন কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের সমর্থক আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্র লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাসির উদ্দিনের সমর্থক ছাত্র লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ ধারালো অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় ৮ জন আহত হয়। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম নামে একজন ছাত্রলীগ কর্মী ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়।

১৮. গত ১১ অগাস্ট শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার আন্ধারমানিক বাজারে রাজনগরে ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়া লীগের নড়িয়া উপজেলা কমিটির সদস্য জাকির হোসেন গাজীর সমর্থকদের সঙ্গে রাজনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দাদন মীরবহরের সমর্থকদের মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এরমধ্যে রাজনগর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন ফকির (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

১৯. গত ১৭ অগাস্ট গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী সন্দেহে রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বাপ্পী, অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মাসুদ মিয়া, মনোবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইব্রাহীম এবং ম্যানেজমেন্ট তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মেহেদীকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে। মেডিকেল সুত্রে জানা যায়, মারধরের কারনে চারজনের হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। হাসপাতালে আহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগের কর্মসূচীতে নিয়মিত না যাওয়ায় এবং তাঁদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং টাকা হাতিয়ে নিতেই শিবির আখ্যা দিয়ে তাঁদের বেধড়ক মারধর করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নসাপেক্ষ কর্মকাণ্ড
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচী প্রশ্নবিদ্ধ
২০. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১৬ জুলাই রোডম্যাপ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এতে সাতটি করণীয় বিষয় নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং সরবরাহ করা।
১৩ এই অনুযায়ী গত ২৫ জুলাই থেকে ৯ অগাস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ভোটার তালিকাঃ
হালনাগাদ করার কার্যক্রম হাতে নেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচী বিভিন্ন কারনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের সময় মাঠকর্মীরা ঢাকাসহ দেশের বেশীরভাগ এলাকায় নতুন ভোটারদের খোঁজে বা বাড়ি যাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রচার ছাড়াই তথ্য সংগ্রহের জন্য কর্মীরা স্থানীয় কোনো একটি স্কুলে বসেছেন। নির্দিষ্ট ওই জায়গায় যাঁরা নিজ আগ্রহে এসেছেন তাঁদের তথ্যই শুধু নেয়া হয়েছে। বরাদ্দ থাকার পরও ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো হয়নি এবং ফর্ম সংকটও ছিল তীব্র। এইসব কারনে ১৮ বছর হয়েছে এমন বিপুলসংখ্যক তরুণ তরুণী ভোটার হতে পারেননি। বিদ্যমান তালিকা থেকে মৃতদের নামও যথাযথভাবে বাদ দেয়া হয়নি। এদিকে তথ্য সংগ্রকারীদের দেখা না পেয়ে অনেকেই নিজ দায়িত্বে ইসি ও এর অধীন অফিসগুলোতে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে তথ্য না রেখে উল্টো ফের তথ্য সংগ্রকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর কথা থাকলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) কাজটিতে গুরুত্ব দেয়নি। ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান তালিকায় ১০ কোটি ১৮ লক্ষ ভোটার রয়েছেন। এবার
হালনাগাদের মাধ্যমে ৩ লক্ষ নতুন ভোটার তালিকাভুক্তির লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে ৭ অগাস্ট পর্যন্ত ১৪ লক্ষ ৫০ হাজার নতুন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্ধেকেরও কম।

আলোচনা ছাড়াই সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণের খসড়াঃ
২১. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনি সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপ করছে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও মিডিয়ার সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছে কমিশন।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও সংলাপ মাত্র শুরু হয়েছে। কিন্তু সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইনের খসড়া চুড়ান্ত করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এই আইন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর করতে চায় কমিশন। গত ২৭ অগাস্ট এই আইনের খসড়া কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ-সংক্রান্ত আইনের খসড়া চুড়ান্ত করা হলে কমিশনের কর্মকান্ডকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করবে।১৫ ইতিমধ্যে ইলেকশন কমিশনের বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরী হয়েছে।

২২. স্বাধীনভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি’র বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থায় যে ধরনের দুর্বৃত্তায়ন ঘটানো হয়েছে তাতে সম্পূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং জনগণ তাঁদের ভোটাধিকার কে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো সাধারণতঃ উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতো এবং জনগণ স্বত:স্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো। কিন্তু বর্তমানের বিরাজমান পরিস্থিতিতে জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অনেকটাই ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগত কর্মচারীর মতই। গত ১৬ ও ১৭ অগাস্ট নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে গণমাধ্যমের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এই সংলাপে সরকারপন্থী নয় এমন চারটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদককেআমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এই সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়। অথচ সবদলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব।

সভা-সমাবেশে বাধাঃ
২৩. দেশে জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থা না থাকায় সরকার বিরোধীদল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। সভাসমাবেশে বাধা এবং হামলা ক র অর্থই হচ্ছে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে দেয়া এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার লংঘন করা। শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ ও মিছিল-র‌্যালি করা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে। অথচ বর্তমানে কোনো সভা সমাবেশ বা মিছিল এমনকি ঘরোয়া সভা করার জন্যও পুলিশের অনুমতি নিতে হচ্ছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিরোধী দল ও ভিন্নামতাবলম্বীদের সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে পুলিশ। বর্তমানে সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন এবং সভা-সমাবেশ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারিদল বিনা বাধায় যে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করছে, তাদের নির্বাচনী প্রতীকের পক্ষে ভোট চাচ্ছে এবং সরকারিদলের নেতা-কর্মীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে থেকে বিরোধীদলের সভা-সমাবেশে হামলা চালিয়ে তা পণ্ড করে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Top