অন্য রকম ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান’ – Live News BD, The Most Read Bangla Newspaper, Brings You Latest Bangla News Online. Get Breaking News From The Most Reliable Bangladesh Newspaper; livenewsbd.co
You are here
Home > জাতীয় > অন্য রকম ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান’

অন্য রকম ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান’

নরসিংদীর গাবতলীর উত্তরপাড়ায় একটি বাড়ি ঘিরে রেখে গতকাল অভিযান চালান র‍্যাব সদস্যরা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ২২ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর নরসিংদীর উত্তর গাবতলীর মেসবাড়িটি থেকে পাঁচজনকে আটকের কথা জানিয়েছে র‍্যাব। র‍্যাবের ভাষ্য, ‘জঙ্গি আস্তানাটিতে’ থাকা পাঁচজন আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তাঁরা জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত নন। সবাই ছাত্র। তাঁদের মধ্যে চারজন ওই বাড়িতে থাকতেন এবং সেখানে নিচের ক্লাসের ছাত্রদের পড়াতেন। অপরজন দশম শ্রেণির ছাত্র, সে প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিল।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁর নাম মো. সালাহউদ্দীন। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুজন নরসিংদী সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের ছাত্র। নাম আবু জাফর ও বাসিকুল ইসলাম। আরেকজন মশিউর রহমান, তিনি স্থানীয় জামিয়া কাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে সদ্য কামিল পাস করে চাকরি খুঁজছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই বাড়িতে এলাকার আরও শিক্ষার্থী প্রাইভেট পড়ত। শনিবার বিকেলেও ওই বাড়িতে ছাত্ররা পড়তে যাচ্ছিল। র‍্যাব নিষেধ করায় তারা আর এগোতে পারেনি।

গতকাল সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে র‍্যাব ওই বাড়ির পাঁচজনকে আটক করে নিয়ে যায়। রাত ৯টার দিকে র‍্যাব-১১-এর নরসিংদীর ক্যাম্পের সিনিয়র এএসপি আলেক উদ্দিন বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বাসিকুল ইসলাম, মশিউর রহমান ও দশম শ্রেণির ছাত্রটিকে রাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সালাহউদ্দীন ও আবু জাফরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।

আবু জাফর শনিবার রাতে নিজের ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে পোস্ট দেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বাঁচান। আমরা নিরপরাধ। আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী। আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। প্লিজ, আমাদের বাঁচান। আমরা সাধারণ ছাত্র। প্লিজ, আমাদের উদ্ধার করুন। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ।’ আরেকটি পোস্টে জাফর লেখেন, ‘সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্যারদের উদ্দেশ করে বলছি, আমরা নিরপরাধ। আমরা কখনো শিবির, জঙ্গিবাদ সম্পর্কে ভালো করে জানিও না। প্লিজ আপনারা আমাদের সার্চ করুন। দেখুন কিছু পান কি না। আমরা নিরপরাধ। বাইরে থেকে আমাদের ছিটকিনি লাগানো। প্লিজ ছিটকিনি খুলে আমাদের উদ্ধার করুন।’

শনিবার বিকেল চারটায় নরসিংদী শহরের উত্তর গাবতলীতে প্রবাসী মঈনুদ্দীনের নির্মাণাধীন একতলা বাড়িটি জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে ফেলে র‌্যাব। এরপর বাড়িটির দরজা বাইরের দিক থেকে আটকে দেয়া হয়। বাড়িটি জামিয়া কাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসার কাছাকাছি। পরে সেখানে স্থানীয় পুলিশ, পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন), সিআইডি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও আসেন। অভিযান স্থলের আশপাশ থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দেয়া হয়।

শনিবার রাত থেকে বাড়ির ভেতর থেকে আটকে পড়া পাঁচজন উদ্ধার পেতে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে থাকেন। শনিবার রাতেই তাঁদের সবার পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পান গণমাধ্যম কর্মীরা। গতকাল ভোর থেকেই ভেতরে আটকে থাকা ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন। সকালে ঘটনা স্থলের কাছে বহু নারী-পুরুষকে জটলা করে থাকতে দেখা যায়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অনেকে আটকে পড়া আবু জাফরের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখান। কেউ কেউ এগিয়ে এসে আটকে পড়া তরুণদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও কথা বলিয়ে দেন।

ভৈরবের বাঁশগাড়ি থেকে এসেছেন আটক মশিউর রহমানের নানা আবদুল হাই। তিনি বলেন, মশিউরের রোববার (গতকাল) ঢাকায় একটি চাকরির পরীক্ষা দিতে যাওয়ার কথা ছিল।

বাসিকুল ইসলামের ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, বাসিকুল, জাফর ও সালাহউদ্দীন ওই এলাকার বিভিন্ন বাসায় বিভিন্ন সময় ভাড়া থেকেছেন। এলাকার অনেকেই তাঁদের চেনেন। শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাসিকুল ফোন করে জানান, তাঁদের ঘরের বাইরে থেকে ছিটকিনি তুলে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি তখনই পাইকারচর থেকে রওনা দেন।

র‍্যাব গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে একে একে পাঁচজনকে বের করে আনে। র‍্যাব জানায়, পাঁচজন আত্মসমর্পণ করেছেন। বেলা ১১টার দিকে ঘটনা স্থলের কাছাকাছি র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, সিলেটের আতিয়া মহল থেকে পাওয়া একটি সূত্র থেকে তথ্য পেয়ে তাঁরা এই ‘আস্তানা’য় অভিযান চালান। এখানে বসবাসরত ব্যক্তিদের কারও কারও সঙ্গে আতিয়া মহলের জঙ্গিদের যোগাযোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘পাঁচজনের নাম পেয়েছি, কিন্তু অন্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও ভাড়াটে তথ্য ফরম যাচাই-বাছাইয়ের পর নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।’

র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, বাড়িটি ৩ মে ভাড়া নেয়া হয়। ভাড়াটে তথ্য ফরমও জমা দেয়া হয়েছিল। ভাড়া নেয়ার সময় যাঁদের তথ্য দেয়া হয়েছিল, তাঁদের কেউ কেউ বাড়িতে থাকেন না। থাকেন অন্য আরও দু-তিনজন। যাঁদের ভাড়া নেয়ার কথা ছিল, তাঁদের সঙ্গে জঙ্গিদের যোগাযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি জানান, তল্লাশি করে বাড়িটিতে অস্ত্র ও বিস্ফোরক কিছুই পাওয়া যায়নি।

গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত অন্তত ২০টি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সব কটি আস্তানার কিছু সাধারণ মিল ছিল। এসব আস্তানায় কারা থাকতেন, কী করতেন, কিছুই জানতেন না আশপাশের মানুষ। আস্তানাগুলোতে যাঁরা থাকতেন তাঁরা ছিলেন পরিবার ও সমাজবিচ্ছিন্ন। সেখানে বাইরের মানুষের যাতায়াত ছিল না। অভিযানগুলোতে জঙ্গিদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলি হয়েছে। জঙ্গিরা ভেতর থেকে বোমা ফাটিয়েছে। অস্ত্র-বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

কিন্তু নরসিংদীর ওই মেসবাড়িতে এমন কিছুই ঘটেনি। সেখানে যাঁরা থাকেন তাঁরা সবাই এলাকাবাসীর পরিচিত, কেউই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন নন। এলাকার অনেকেই যেচে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ছেলেগুলো ভালো, তাদের বাঁচান।’

এই ব্যাপারে র‍্যাবের মুখপাত্রের বক্তব্য জানতে গতকাল সন্ধ্যার পর কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

আতঙ্কে আরেক বাসিন্দা

ওই মেসবাড়ির আরেক বাসিন্দা নরসিংদী কলেজ থেকে সম্প্রতি মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়া আল আমিন। তিনি এখন আতঙ্কে আছেন। তিনি গতকাল রাত আটটার দিকে কারওয়ান বাজারের কার্যালয়ে এসে উপস্থিত হন। তিনি বলেন, তিনি গত শুক্রবার অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা দিতে ঢাকায় আসেন। শনিবার ঢাকায় থাকতেই তাঁদের মেসে অভিযানের কথা শোনেন। এরপর থেকে আতঙ্কে আছেন। গতকাল ময়মনসিংহের ভালুকায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে র‍্যাব যায়। তাঁর ভাইয়ের মুঠোফোন থেকে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করে নরসিংদীতে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছেন। এরপর তিনি ঢাকায় কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার কাছে যান।

আল আমিন বলেন, ওই বাড়িটিতে তিনি ও মো. নাঈম নামের আরও একজনও থাকতেন। নাঈম স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে কামিল পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনিও চাকরির চেষ্টা করছিলেন।

আল আমিন বলেন, আটক সালাহউদ্দীন ও জাফর একসঙ্গে পাশের মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। এরপর সালাউদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর জাফর নরসিংদী সরকারি কলেজে পড়েন। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে জাফর মেসে থেকেই অনেক ছাত্রছাত্রী পড়াতেন। তাঁদের রাজনৈতিক কোনো যোগাযোগ ছিল না। সবাই চেষ্টা করছিলেন একটি চাকরি পাওয়ার। এর মধ্যে তিনি (আল আমিন), জাফর ও নাঈম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি জানান, আটক জাফরের মাস্টার্স পরীক্ষা চলছে, আরও তিনটি পরীক্ষা বাকি রয়েছে। সালাউদ্দীন মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে দুই মাস আগে তাঁদের সঙ্গে আবার মেসে ওঠেন। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, একই সঙ্গে টিউশনি করছিলেন।

Leave a Reply

Top